ব্যাংকঋণের চড়া সুদের হার হঠাৎ কমিয়ে আনা কোনো সহজ সিদ্ধান্ত নয় বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। তাঁর মতে, সুদের হার একদিকে কমালে অর্থনীতির অন্য খাতে চাপ তৈরি হয়, যা সামগ্রিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
আজ শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘ব্যাংকিং অ্যালমানাক’-এর সপ্তম সংস্করণের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন অর্থ উপদেষ্টা।
সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘রেট অব ইন্টারেস্ট কমিয়ে দেওয়া খুব সহজ কাজ না। এখানে ব্যাংক রেটের সঙ্গে ট্রেজারি বিলের রেট যুক্ত। একদিকে চাপ দিলে অন্যদিকে বেলুনের মতো ফুলে যাবে। এতে শেষ পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাই সুদের হার ব্যবস্থাপনায় ধারাবাহিকতা ও সমন্বয় জরুরি।’
অর্থ উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর থাকা ছয়-নয় সুদহার নীতি তুলে নেওয়ার পর বাজারভিত্তিক ব্যবস্থায় ঋণের সুদ ১৪-১৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এর ফলে বিনিয়োগ প্রবণতা কমেছে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে মিলিয়ে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।’
তবে অর্থ উপদেষ্টা জানান, সুদের হার একেবারেই কমেনি, এমনটি নয়। ট্রেজারি বিলের সুদ ইতিমধ্যে কমেছে এবং এর প্রতিফলন ধীরে ধীরে বাজারে দেখা যাবে। তিনি আরও বলেন, ‘ট্রেজারি বিলের সুদ ১২ শতাংশ থেকে কমে প্রায় ১০ শতাংশে এসেছে। যাঁরা এই বাজারে যুক্ত, তাঁরা সেটা বুঝতে পারছেন। তথ্যের প্রতিফলন হয়তো এখনো পুরোপুরি বাজারে আসেনি।’
সঞ্চয়পত্র বা সরকারি ঋণের সুদ বাড়ালে ব্যাংক আমানতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে উল্লেখ করে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এতে মানুষ ব্যাংকে টাকা না রেখে বিকল্প খাতে চলে যাবে। অথচ ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোই সঞ্চয় ও ঋণের মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজ করে।’
ব্যাংক খাত প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার সময় ব্যাংকিং খাত ছিল চাপের মধ্যে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ব্যাংকের প্রভিশনিং ও ঋণ কার্যক্রমে ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যা ব্যাংকিং অ্যালমানাকের তথ্যেও প্রতিফলিত হয়েছে।’
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘কেবল মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, বাজার তদারকি এবং ব্যবসায়ী ও ভোক্তা পর্যায়ের সহযোগিতা ছাড়া টেকসই সমাধান আসবে না। ইনফ্লেশন একটি সংবেদনশীল ও রাজনৈতিক বিষয়।’
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনস ডিভিশনের সচিব নাজমা মোবারেক, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার ও বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতায় শিক্ষাবিষয়ক সাপ্তাহিক পত্রিকা শিক্ষাবিচিত্রা ২০১৬ সাল থেকে নিয়মিতভাবে ‘ব্যাংকিং অ্যালমানাক’ প্রকাশ করে আসছে। এতে দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম, সেবা ও আর্থিক সূচকের হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করা হয়, যা গবেষক, পেশাজীবী ও বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভান্ডার হিসেবে বিবেচিত।