হোম > সারা দেশ > সুনামগঞ্জ

হাওরে নয়া দুর্যোগ জলাবদ্ধতা

বিশ্বজিত রায়, সুনামগঞ্জ

কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে দেখার হাওরের কিছু অংশে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। পরে বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করেন স্থানীয় কয়েকজন কৃষক। গত সোমবার শান্তিগঞ্জ উপজেলার লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের গুজাউনি বাঁধ এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

হাওরে এত দিন বোরো ধানের মৌসুমে কৃষকের দুশ্চিন্তার কারণ ছিল অকালবন্যা ও পাহাড়ি ঢল। এবার নতুন করে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত বাঁধে জলাবদ্ধতা। পানি নিষ্কাশনের পথ না থাকায় সুনামগঞ্জে এবার ১০ হাজার হেক্টরের বেশি জমি পানিতে তলিয়েছে। পানি নিষ্কাশনে বাঁধ কাটা নিয়ে প্রশাসন ও কৃষকের মাঝে বিরোধও দেখা দিয়েছে। ঘটেছে প্রাণহানির ঘটনা।

কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জে জলাবদ্ধতায় প্রাথমিকভাবে ক্ষতি হয়েছে ৩ হাজার ১৮৯ হেক্টর জমির। এ বছর প্রায় ২ লাখ কৃষক ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করেছেন। এতে প্রায় ১৪ লাখ টন ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলার ছোট-বড় ৯২টি হাওরে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ১ হাজার ৪৭৩ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি অধিদপ্তর।

সুনামগঞ্জের হাওর এলাকায় কয়েক সপ্তাহের টানা বৃষ্টিতে সব হাওরে কমবেশি জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। কৃষকেরা বলছেন, এই বৃষ্টির কারণে কয়েক হাজার হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে।

সুনামগঞ্জ সদর, শান্তিগঞ্জ, ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত দেখার হাওরের মোট জমি ৪৫ হাজার ৮৫৯ হেক্টর। এর মধ্যে ২৪ হাজার ২১৪ হেক্টর আবাদযোগ্য জমিতে ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৪০ হাজার ৪০০ টন। গত সোমবার সরেজমিনে দেখা যায়, দেখার হাওরের ভেতরের মহাসিং নদ থইথই করছে। সেই পানি আটকাতে জয়কলস ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি অংশে বাঁধ দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এর মধ্যে উথারিয়া বাঁধ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ওই বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের পথ তৈরি করছেন কৃষকেরা। তবে নদীতে যে পরিমাণ পানি, তাতে বাঁধ কেটে দিয়েও হাওর ঝুঁকিমুক্ত হবে, তেমনটা মনে হয়নি।

বাঁধ কাটা নিয়ে উত্তেজনা

সরেজমিনে দেখা যায়, দেখার হাওরে ধান কাটা তেমন শুরু হয়নি। এই হাওরে পুরোদস্তুর ধান কাটা ও মাড়াই শুরু হতে আরও ১০ দিন লাগবে। এর মধ্যে বৃষ্টি হলে নদীতীরবর্তী উঁচু স্থান (আফর) উপচে তলিয়ে যেতে পারে হাওর। কোনো কোনো অংশ আফর ছুঁয়ে হাওরে পানি ঢোকার দৃশ্যও চোখে পড়ে।

হাওরের গুজাউনি বাঁধ এলাকায় কাটা ধানের আঁটি স্তূপ করছিলেন সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দরিয়াবাজ গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘কারও মতামত ছাড়াই উথারিয়া বাঁধ দেওয়া হয়েছে। এই বাঁধ কাটার দাবি জানালেও কেউ শোনেনি। এরপর বৃষ্টি হলে হাওর রক্ষা করা সম্ভব হবে না।’

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টানা বৃষ্টিতে ফসল তলিয়ে গেলে অনেক জায়গায় প্রশাসনের বাধ্যবাধকতা উপেক্ষা করে কৃষকেরা নিজেদের উদ্যোগেই বাঁধ কেটে দিয়েছেন। আবার কোনো জায়গায় বাঁধ কাটতে বাধা দেওয়ায় কৃষকের মাঝে অসন্তোষ দানা বেঁধেছে। সেই উত্তেজনা দূর করতে গত রোববার দেখার হাওরের উথারিয়া বাঁধে যান স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ জেলা প্রশাসন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্তাব্যক্তিরা। পরে বাধ্য হয়ে উথারিয়া বাঁধ কাটতে নির্দেশনা দেয় প্রশাসন।

উথারিয়া বাঁধ কাটায় অংশ নেন শান্তিগঞ্জ উপজেলার জয়কলস ইউনিয়নের আস্তমা গ্রামের কৃষক নবিদ আলী। বাঁধে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘ডুবরার পানি আইয়া জমি খাইলাইছে। বান্ধ ভাইঙা দেওয়া যায় না। পিআইসি অখলতে না করে। এইখানও আমরার বহুত জমিন আছে। ডুইব্যা গেছে। এইখানে আমরার স্লুইসগেইটের দরকার।’

এ ব্যাপারে পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশমির রেজা বলেন, এবার নয়া দুর্যোগ জলাবদ্ধতা। বৃষ্টির পানি রোধে স্লুইসগেইট অপরিহার্য হলেও তার কোনো পরিকল্পনা নেই। ফসল রক্ষার সংগ্রামে কৃষক বারবার নাস্তানাবুদ হচ্ছেন। গবেষণা ও পরিকল্পনা ছাড়াই যত্রতত্র বাঁধ দিয়ে কৃষকদের বিপর্যয়ে মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এ থেকে পরিত্রাণ চায় হাওরবাসী।

মারা গেছেন একজন

সম্প্রতি মধ্যনগর উপজেলার রূপেশ্বর হাওরের ফসল বাঁচাতে কয়েক গ্রামের কৃষক গুরমার হাওরের ৮ নম্বর উপ-প্রকল্পের শৌলডুয়ারি বাঁধ কেটে দেন। ১২ এপ্রিল পানি নিষ্কাশনের পথ তৈরি করতে গিয়ে বাঁধের তীর ধসে আরমান মিয়া (১৮) মারা যান। ওই যুবক মধ্যনগর উপজেলার শালীয়ানি গ্রামের চানপর মিয়ার ছেলে। অসচ্ছল আরমানের পরিবারে এখনো মাতম চলছে।

আরমান মিয়ার নিকটাত্মীয় আবুল হাসেম বলেন, এ বছর আরমানের পরিবার ১৫ বিঘার মতো জমি বর্গা চাষ করেছিল। তার বেশির ভাগ জমিই ডুবে গেছে। জমি বাঁচাতে আরমান বাঁধে নেমেছিলেন। শেষ পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এই বাঁধ কেড়ে নিল তাঁকে।

সুনামগঞ্জ কৃষি অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, আগামী সপ্তাহে ধান কাটা পুরোপুরি শুরু হবে। পানি থাকায় মেশিনে ধান কাটা অনেকটা দুরূহ হবে। তবে সপ্তাহখানেক বৃষ্টি কম হওয়ায় পানি কমতে শুরু করেছে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, ‘বিগত সময়গুলোতে স্লুইসগেইট নির্মাণ করা যাবে না, এ রকম নির্দেশনা ছিল। আমরা গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাছাই করেছি। স্লুইসগেইটের পাশাপাশি বক্স আউটলেট দেওয়ার চিন্তাভাবনা আছে।’

আবারও ভেঙে গেছে বেইলি সেতুর পাটাতন, মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ

সুনামগঞ্জে হাওর বাঁচাও আন্দোলনের মানববন্ধন–স্মারকলিপি

হাওরে বাঁধের মাটি ধসে যুবকের মৃত্যু

সুনামগঞ্জে গুজাউনি বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকছে হাওরে

শাল্লায় হাওরের বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের কাজে ১৪৪ ধারা জারি

সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল: ফসল বাঁচাতে মরিয়া কৃষক, কাটছেন বাঁধ

‘আমার আব্বুরে আনা খাবাইয়া মারছে, আমি আব্বুর লগে মাততাম চাই’

সুনামগঞ্জে বাঁধ কাটা নিয়ে সংঘর্ষে ২০ জন আহত, ১৪৪ ধারা জারি

হাওরে ডুবে গেছে কয়েক হাজার হেক্টর ধানখেত

ভূমধ্যসাগরে ডুবে মৃত্যু: সুনামগঞ্জে চার মানব পাচারকারীর বিরুদ্ধে মামলা