হোম > সারা দেশ > সুনামগঞ্জ

সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল: ফসল বাঁচাতে মরিয়া কৃষক, কাটছেন বাঁধ

বিশ্বজিত রায়, সুনামগঞ্জ

বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে এ রকম হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। গতকাল সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার হালি হাওরের রাতলার খাল এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

বছরের একমাত্র ভরসা বোরো ফসল পচে যাওয়ায় দিশাহীন হয়ে পড়েছেন সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা। টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তাঁদের চোখে এখন শুধু হতাশা। অভিযোগ, অপরিকল্পিত ও ত্রুটিপূর্ণ বাঁধ ফসল রক্ষার বদলে বিপর্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, আর শেষ সম্বল বাঁচাতে মরিয়া হয়ে বাঁধ কাটার মতো ঝুঁকিপূর্ণ পথে হাঁটছেন কৃষকেরা। বাঁধ কাটতে গিয়ে সুনামগঞ্জ সদর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা উপজেলায় একাধিক দাঙ্গা-হাঙ্গামার ঘটনাও ঘটেছে।

গতকাল বুধবার দুপুরে জামালগঞ্জের হালি হাওরের রাতলার খাল অংশে গিয়ে দেখা যায়, সেখানকার অন্তত ১৫ গ্রামের কৃষক তাঁদের নিজস্ব খরচে বেশ কয়েকটি বড় মেশিন লাগিয়ে পানি সেচ করছেন। কথা হয় মমিনপুর গ্রামের কৃষক আফাজ উদ্দিন, আব্দুল গনি, আবুল কালাম, জাকির হোসেনসহ বেশ কয়েকজনের সঙ্গে। রাতলার খাল অংশে ১৬ কিয়ার (২৫ শতকে এক কিয়ার) জমিতে বোরো আবাদ করা আফাজ উদ্দিন জানান, বেশির ভাগ জমি নিচু হওয়ায় প্রায় সবটুকুই তলিয়ে গেছে। নষ্ট হয়ে পচন ধরেছে ধানে।

পানি সেচে অংশ নেওয়া ঝুনুপুর গ্রামের আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘এখানকার ১৫ গ্রামের অন্তত ২ হাজার একর জমি পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওই একটি ফলনই আমাদের ভরসা। একটা লুঙ্গি কিনলেও ধান বিক্রি করে কিনতে হয়। ছেলেমেয়ের পড়াশোনা, বিয়েসহ সব খরচই এই ফলনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বৃষ্টির পানি সব শেষ করে দিয়ে গেল।’

শঙ্কা প্রকাশ করে আজিজুল বলেন, ‘সরকার চারদিকে বাঁধ দিয়েছে ফলন বাঁচানোর জন্য। কিন্তু এই বাঁধের কারণেই অনেক জায়গায় পানি জমে কাঁচা ধান নষ্ট হয়েছে। কোটি টাকা খরচ করে যদি ফলনই না বাঁচে, তাহলে বাঁধ দিয়া কী লাভ?’

হালি হাওরের নেত্তুয়ার কাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, হাওরের নিচু জমিনের প্রায় সবটুকুই নষ্ট হয়ে গেছে। কোনো জায়গায় কোমরসমান পানি, কোনো জায়গায় হাঁটুসমান পানিতে ভাসছে শত শত একর বোরো ফলন। পচে গিয়ে শেওলা ধরেছে অধিকাংশ ধানগাছে।

অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলার প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমি জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের কোনো তথ্য না থাকলেও আক্রান্ত জমির পরিমাণ মাত্র ১২শ’ হেক্টর বলে দাবি কৃষি অধিদপ্তরের। বিষয়টি হাস্যকর বলছেন হাওর আন্দোলনের নেতারা।

শান্তিগঞ্জের পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের কাড়াড়াই গ্রামের কৃষক আলতাফ হোসেন ও ছুনু মিয়া বলেন, ‘দেখার হাওরে ডুবরার পানি (ডুবে যাওয়া অবস্থা) জমে আমাদের শেষ সম্বল প্রায় নষ্ট হওয়ার পথে। আমরা প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে নিজেদের খরচে বাঁধ কেটে দিয়েছি। দ্রুত পানি বের হচ্ছে। পানি সরে গেলে ফলন হয়তো কিছুটা রক্ষা পাবে।’

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, জেলার প্রায় ৫৩টি হাওরে এ বছর ৭০২টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) হয়েছে। ৫৮৫ কিলোমিটার বাঁধের প্রাক্কলিত ব্যয় ১৪৫ কোটি টাকা। কৃষি অধিদপ্তর জানিয়েছে, ছোট-বড় ৯৫টি হাওরের ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১০ হেক্টর জমি আবাদ হয়েছে। এ থেকে ১৪ লাখ টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতি সুনামগঞ্জের সহসভাপতি খায়রুল বশর ঠাকুর খান বলেন, একদিকে নিচু জমি তলিয়েছে। অন্যদিকে পানি থাকায় মেশিনে ধান কাটা যাবে না। উভয় সংকটে হাওরবাসী। সংকট মোকাবিলায় বাঁধ কাটা হচ্ছে। আবার মেশিন লাগিয়ে পানি সেচের প্রাণপণ চেষ্টা চলছে কৃষকের। অপরিকল্পিত বাঁধ ও যথাস্থানে জলকপাট না থাকাটাই কৃষকের শ্রম-ঘামের কষ্টটাকে আরও ভারী করেছে।

সুনামগঞ্জ জেলা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি মো. ইয়াকুব বখত বাহলুল বলেন, পাহাড়ি ঢল আসেনি, তারপরও বৃষ্টির পানি জমে ডুবরায় নিচু জমি তলিয়ে গেছে। বাঁধ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো পরিকল্পনা নেই। পানি নিষ্কাশনের সুনির্দিষ্ট জায়গা চিহ্নিত করে স্লুইস গেট (জলকপাট) নির্মাণ করতে হবে। না হলে কৃষক প্রতিবছরই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কমিটি হয়েছে। কৃষকের ফলন রক্ষায় আমরা সব ধরনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছি।

শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, ‘কৃষক ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে যেদিকে পানি নিষ্কাশনের সুযোগ আছে, সেদিকে বাঁধ কেটে দিয়েছি। এখানকার চারটি অংশে বাঁধ কাটা হয়েছে। আমরা সার্বক্ষণিক বিষয়টি দেখভাল করছি।’

সুনামগঞ্জ কৃষি অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ওমর ফারুক জানান, বিভিন্ন হাওরে ১ হাজার ১৮৯ হেক্টর জমি পানিতে আক্রান্ত হয়েছে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত নয়। জলাবদ্ধতায় কত কৃষক আক্রান্ত হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। পানি সরে গেলে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি জানা যাবে।

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, ‘১০টি হাওরের ২৬টি পয়েন্টে এ পর্যন্ত বাঁধ কাটা হয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় কৃষক নিজেদের উদ্যোগে বাঁধ কেটেছে। আবার কিছু জায়গায় আমাদের কমিটির উদ্যোগে বাঁধ কাটা হয়েছে।’

‘আমার আব্বুরে আনা খাবাইয়া মারছে, আমি আব্বুর লগে মাততাম চাই’

সুনামগঞ্জে বাঁধ কাটা নিয়ে সংঘর্ষে ২০ জন আহত, ১৪৪ ধারা জারি

হাওরে ডুবে গেছে কয়েক হাজার হেক্টর ধানখেত

ভূমধ্যসাগরে ডুবে মৃত্যু: সুনামগঞ্জে চার মানব পাচারকারীর বিরুদ্ধে মামলা

সুনামগঞ্জের আরও ১৩ তরুণ জিম্মি লিবিয়ায়

সুনামগঞ্জে ১২ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পুড়ে ছাই

স্বপ্নের ইউরোপ এখন সুনামগঞ্জের কান্না

সুনামগঞ্জে নদীর পাড়ে বালুচাপায় শ্রমিকের মৃত্যু, আহত ১

সাগরেই শেষ ইউরোপের স্বপ্ন: গ্রিস উপকূলে প্রাণ হারানোদের ১০ জনই সুনামগঞ্জের

সুনামগঞ্জে গরুর জন্য ধান কাটা নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষ, নিহত ১