রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আব্দুল আজিজের বিরুদ্ধে এবার টিআর প্রকল্পের টাকা নয়ছয়ের অভিযোগ উঠেছে। পিআইও নিজেই ৫০ লাখ টাকার ১৫ থেকে ১৬টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন বলে জানা গেছে। তবে ওই সব প্রকল্পে কাগজে-কলমে সভাপতি করা হয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যদের।
গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার প্রকল্পগুলো (টিআর, কাবিখা-কাবিটা) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার (ডিআরও) তদারকি করার কথা। অভিযোগ রয়েছে, ওই কর্মকর্তারা দেখেও না দেখার ভান করছেন।
এর আগে ২০২৪ সালে পিআইও আব্দুল আজিজ পীরগাছা উপজেলায় কর্মরত থাকাকালীন অন্নদানগর ইউনিয়নের শল্লারবিল আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৫৬৬ মেট্রিক টন গম আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। পরে তাঁকে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় বদলি করা হয়। সেখানে মাস যেতে না যেতেই তিনি বদলি হয়ে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলায় আসেন।
জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিটা—নগদ অর্থ) কাজের জন্য পীরগঞ্জ উপজেলার ১৫ ইউনিয়নে ২ কোটি ১০ লাখ ৬৪ হাজার টাকার বরাদ্দ পাওয়া যায়। ওই বরাদ্দের বিপরীতে ৭২টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পগুলোর চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয় জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে।
এরপর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আব্দুল আজিজ সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি নেন। এর মধ্যে ১৫ থেকে ১৬টি প্রকল্পের সভাপতি ইউনিয়নের সদস্যদের করা হলেও তাঁরা শুধু প্রকল্পের বিল উত্তোলনের চেকে স্বাক্ষর করেছেন বলে জানা গেছে। তাঁদের কাজ করতে দেওয়া হয়নি।
প্রকল্পগুলো পরিদর্শন করে পিআইওর নিজের পরিচালিত ১৫ থেকে ১৬টি প্রকল্পের সন্ধান পাওয়া গেছে। চতরা ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্য খোকন মিয়া বলেন, ‘পিআইও স্যার আমাকে একটি প্রকল্পের সভাপতি করতে ছবি ও ভোটার আইডি কার্ড নিয়েছেন। এরপর তিনি তাঁর অফিসের লোক দিয়ে কাজ করাচ্ছেন। শুধু বিল উত্তোলনের জন্য চেকে আমার সই নিয়েছেন।’
কাবিলপুর ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী সদস্য রীমা বেগমকে ‘নিজ কাবিলপুর খিয়ারপাড়ার জিল্লুর বাড়ি হতে বাদশার বাড়ি পর্যন্ত এইচবিবি রাস্তাগামী রাস্তার সলিংকরণ ও সংস্কার’ কাজের প্রকল্পে সভাপতি করা হয়। এতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তাঁকে শুধু প্রকল্পের সভাপতি করে তাঁর কাছ থেকে বিল উত্তোলনের জন্য চেকে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
রীমা বেগম বলেন, ‘আমি শুধু নামেই প্রকল্পের সভাপতি। পিআইও অফিসের কার্য সহকারী আতিক মিয়া এসে কাজটি তদারকি করে চলে যান।’
অভিযোগ অস্বীকার করে পিআইও আব্দুল আজিজ বলেন, ‘আমি কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি করি না, সব সময় ভালো থাকার চেষ্টা করি। কিন্তু এখানে দু-একজন সাংবাদিক অনৈতিক সুবিধা না পেয়ে আমার পেছনে লেগেছে।’
পিআইও আব্দুল আজিজ বলেন, ‘প্রকল্পের কাজ আমার নিজে করার কোনো সুযোগ নেই। তবে বিশেষ কারণে দু-একটি প্রকল্প এদিক-সেদিক হতে পারে। সেগুলোর সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’
রংপুর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়া বলেন, ‘পীরগঞ্জ উপজেলার পিআইও এবং ইউএনওর পাঠানো প্রকল্পতালিকা বিধি মোতাবেক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের কাজ বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব ইউএনও ও পিআইওর। কিন্তু পিআইও নিজে প্রকল্প বাস্তবায়ন করার কিংবা সদস্যদের মাধ্যমে করে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যদি তিনি এমন কাজ করে থাকেন, তা আমার জানা নেই।’
তিনি আরও বলেন, ওই পিআইওর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে তিনি পিআইওর কাছ থেকে উৎকোচ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পপি খাতুন বলেন, ‘চেয়ারম্যান-মেম্বারদের যোগসাজশে পিআইও টিআর প্রকল্প নিজে বাস্তবায়ন করছেন কি না, এটা আমার জানা নেই। তবে আমি পিআইওর কাছ থেকে কোনো ধরনের অনৈতিক সুবিধা নিইনি। যদি কেউ আমার নামে এমন অভিযোগ করে থাকে, তা মিথ্যা।’
রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, ‘আমি সম্প্রতি এ জেলায় যোগদান করেছি। বিষয়টি আপনার (সাংবাদিক) কাছ থেকে প্রথম শুনলাম। অবশ্যই তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’