বাজারে বাজারে ঘুরে মানুষের কাছ থেকে সাহায্য তোলেন সুফিয়া বেগম। ১১ মে দেড় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে সেই টাকায় টিসিবির পণ্য কিনেছিলেন তিনি। পেয়েছিলেন মসুর ডাল, তেল, চিনি আর চাল। সবকিছু ঠিক থাকলেও সুফিয়া চুলায় জ্বাল দিয়ে ডাল সেদ্ধ করতে পারছেন না।
সুফিয়া ভাড়া থাকেন রাজশাহী নগরের দরগাপাড়া মহল্লায়। তিনি বলেন, ‘ত্যাল, চিনি, চাইল ঠিকই আছে। কিন্তুক ডাইল কুনুমতেই সিদ্ধ হচ্ছে না বাপ। এক ঘণ্টা জাল দিয়্যা লাকড়ি-খড়ি সব শেষ কইরে দিনু। তারপরও ডাইল সিদ্ধ করতে পারনু না। ছ্যাবড়া ছ্যাবড়া হইয়্যা গেল।’
সুফিয়া বেগমের এই অভিযোগ খতিয়ে দেখতে আরও পাঁচজনের সঙ্গে কথা বলেছে আজকের পত্রিকা। তারাও একই ধরনের অভিযোগের কথা জানিয়েছেন। একই এলাকার বাসিন্দা নূরেসা বেগম বলেন, ‘প্রথমে চুলায় রান্না করছিলাম। ডাল সেদ্ধ হচ্ছে না দেখে গ্যাসের চুলায় দিলাম। তা-ও সেদ্ধ হয় না। এক ঘণ্টা পর একটু নরম হলো। কোনোমতে রান্না করলাম।’
টিসিবিতে ডাল সরবরাহকারী একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তাপমাত্রার প্রভাবে বর্ষাকালে মসুরের ডাল সেদ্ধ হতে সময় একটু বেশি লাগে। আর টিসিবির আঞ্চলিক কার্যালয় জানিয়েছে, ডাল সেদ্ধ না হওয়ার বিষয়টি ডিলারদের কাছ থেকে জেনে মৌখিকভাবে প্রধান কার্যালয়কে জানানো হয়েছে। বিষয়টি এখন প্রধান কার্যালয় খতিয়ে দেখবে।
নগরের কাশিয়াডাঙ্গা এলাকার গৃহবধূ তাহেরা খাতুন বলেন, ‘ডাল মনে হচ্ছে অনেক দিনের পুরোনো। ভেতরে কালো কালো দানা আছে। গমও পাওয়া যাচ্ছে। মান খুবই খারাপ। এই ডাল প্রেশার কুকার ছাড়া কোনোমতেই সেদ্ধ করা যাচ্ছে না। এক দিন রান্নার পর রেখেই দিয়েছি।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে এই গৃহবধূ বলেন, ‘মানুষ কত কষ্ট করে রোদের মধ্যে লাইনে দাঁড়িয়ে মাল কিনছে। ডাল এত খারাপ হলে হয়। সরকার দিবে যখন দেখেশুনে একটু ভালোই দিবে। ফেলে দিতে হলে তো কোনো লাভ নাই। মনে করছে গরিব মানুষ খাবে, দিলেই হলো।’
টিসিবির ডিলার রাজশাহীর মেসার্স দুলুফা স্টোরের আলমগীর হোসেন বলেন, ‘ডাল খারাপ দু-একজন বলেছে। এটা নিয়ে তো আমাদের কিছু করার নাই। মাল খারাপ হলে টিসিবিকে বলতে হবে। তারা কোন ঠিকাদারের কাছ থেকে কেনে আমরা বলতে পারব না।’
টিসিবি সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে টিসিবির ১৪টি আঞ্চলিক কার্যালয় রয়েছে। বর্তমানে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানির পর মিলে প্রক্রিয়াজাত করা ডাল সরবরাহ করছে। এর মধ্যে এক ব্যক্তি পাবনার রায় অ্যাগ্রো ফুড প্রোডাক্ট ও জয়তুন অটোরাইস অ্যান্ড ডাল মিলের নামে ডাল সরবরাহ করছে। দুটি প্রতিষ্ঠানের চালানের কপিতে একই মোবাইল নম্বর রয়েছে। এ ছাড়া পুষ্টি, ঢাকার ধামরাইয়ের কেবিসি অ্যাগ্রো ও চট্টগ্রামের পায়েল ট্রেডার্স মসুর ডাল সরবরাহ করছে। এর মধ্যে পায়েল ট্রেডার্স রাজশাহীর বানেশ্বরের বিসমিল্লাহ ফ্লাওয়ার অ্যান্ড ডাল মিল থেকে ডাল দিয়েছে। গত বছরের জুন থেকে চলতি মে মাস পর্যন্ত টিসিবির আঞ্চলিক কার্যালয়ের অধীনে থাকা রাজশাহী, নাটোর, পাবনা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের জন্য ৮ হাজার ৮০০ টন ডাল কেনা হয়েছে।
রাজশাহীর চার জেলায় টিসিবির ২৯৯ জন ডিলার আছেন। টিসিবির কার্ডধারী ৪ লাখ ৭২ হাজার ৭৮৪ জন ভোক্তার মধ্যে সরকারের ভর্তুকি মূল্য ৬০ টাকায় মসুর ডাল বিক্রি করা হয়। আর খোলা ট্রাকে যেকোনো মানুষের কাছে ডাল বিক্রি করা হয় ৭০ টাকা কেজি দরে।
পায়েল ট্রেডার্সের মালিক আশুতোষ মহাজন বলেন, ‘আমরা তো বানেশ্বরের বিসমিল্লাহ থেকে মাল নিয়েছি। ডালের সমস্যার বিষয়টা জানা ছিল না। জেনে ভাল হলো, খোঁজ নিচ্ছি।’ বানেশ্বরের বিসমিল্লাহ ফ্লাওয়ার অ্যান্ড ডাল মিলের ব্যবস্থাপক মো. সুমন বলেন, ‘আমরা ভালো মাল দেওয়ার চেষ্টা করি। তারপরও ভুলত্রুটি হতে পারে। আগামীতে সতর্ক থাকব।’
ধামরাইয়ের কেবিসি অ্যাগ্রোর সিনিয়র ম্যানেজার জয়নাল আবেদীন এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। রায় অ্যাগ্রো ফুড প্রোডাক্ট এবং জয়তুন অটোরাইস অ্যান্ড ডাল মিলের ব্যবস্থাপক পলাশ কুমার পোদ্দার বলেন, ‘আমরা সাত-আট বছর ধরে টিসিবিতে ডাল দিচ্ছি। ডাল সেদ্ধ হচ্ছে না এমন অভিযোগ এবারই প্রথম পেলাম। তবে বর্ষাকালে ডাল সেদ্ধ হতে একটু সময় বেশি লাগে। তবে ফুটন্ত গরম পানিতে ৩০ মিনিটের মধ্যে ডাল সেদ্ধ হয়ে যাওয়ার কথা।’
টিসিবির রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ের অফিস প্রধান আতিকুর রহমান বলেন, ‘ডাল গুদামে এলে আমাদের কর্মীরা দেখে নেন। সম্প্রতি এক ট্রাকে ২০ টন ডাল নরম পেলে সেটি আমরা তিনবার ফেরত পাঠিয়েছি। এভাবে ডালের ভালো মান নিশ্চিত করার চেষ্টা করি। তারপরও অভিযোগ পেয়েছি ডাল সেদ্ধ হচ্ছে না। বিষয়টি মৌখিকভাবে প্রধান কার্যালয়ে জানানো হয়েছে।’