জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) কয়েকজন শিক্ষকের একটি প্রাথমিক তালিকা ও সংশ্লিষ্ট তথ্য-প্রমাণ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলামের কাছে জমা দিয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু)। তালিকার সঙ্গে একটি অভিযোগপত্রও জমা দেয় তারা।
আজ মঙ্গলবার দুপুরে উপাচার্যের কার্যালয়ে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মার এসব নথি হস্তান্তর করেন।
অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৬ জুন থেকে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করলেও তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আন্দোলনে বাধা, চাপ সৃষ্টি ও দমনমূলক ভূমিকা পালন করে। এতে তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা, বিভিন্ন অনুষদের শিক্ষক, আবাসিক হল প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে ওই বছরের ১৪ জুলাই নারী শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে অংশ নেওয়া ঠেকাতে বিভিন্ন আবাসিক হলের ফটকে তালা দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৫ জুলাই ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের অস্ত্র নিয়ে অবস্থান, ১৬, ১৭ ও ২৮ জুলাই আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে তল্লাশি, মামলা ও দমন-পীড়ন এবং ১৭ জুলাই প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বলপ্রয়োগের অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া একই বছরের ৩১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধে বিশ্বাসী শিক্ষকসমাজ’-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত অবস্থান কর্মসূচির বিষয়টিও অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই কর্মসূচিতে প্রশাসনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে আওয়ামীপন্থী শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছিল।
অভিযোগপত্রে এসব ঘটনায় তৎকালীন উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, ট্রেজারার, প্রক্টর, ছাত্র উপদেষ্টা, রেজিস্ট্রার, বিভিন্ন অনুষদের ডিন, হল প্রশাসন, শিক্ষক সমিতির নেতাসহ সংশ্লিষ্টদের নাম উল্লেখ করে নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানানো হয়েছে।
রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, তালিকাভুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন জাতীয় টেলিভিশন চ্যানেলের ফুটেজ, সংবাদ প্রতিবেদন ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। নথিতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের নাম, বিভাগ ও জুলাই আন্দোলনের সময় তাঁদের ভূমিকার বিবরণ সংযুক্ত রয়েছে।
সালাহউদ্দিন আম্মার আরও বলেন, ‘আমরা আজ তিনটি বিষয় নিয়ে উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনা করেছি। প্রথমত, ১৬ জুলাইকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ইতিহাসের অংশ হিসেবে ‘‘সন্ত্রাস প্রতিরোধ দিবস’’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছি। দ্বিতীয়ত, আওয়ামীপন্থী শিক্ষক-কর্মচারীদের বিষয়ে গত দুই বছরে দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না হওয়ায় এ বিষয়ে প্রশাসনের কাছে একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা চেয়েছি।’
আম্মার আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে বিচার পাওয়ার অধিকার আমাদের রয়েছে। রাকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও এ বিষয়ে একমত হয়েছেন। আমাদের কাছে যেসব আওয়ামীপন্থী শিক্ষকের তালিকা রয়েছে, তাদের কাউকে পেলে আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সোপর্দ করব। প্রয়োজনে আমরা নিজেরাই বাদী হয়ে মামলা করব। জুলাইয়ের ঘটনায় কোনো ধরনের আপস হবে না।’
রাকসুর এজিএস সালমান সাব্বির বলেন, ‘জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়েই আমরা নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি। কিন্তু যেসব শিক্ষক ওই আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে গত দুই বছরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। বরং তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ এখনো জুলাইয়ের চেতনা ও গণ-অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টা করছেন। তাই আমরা তথ্য-প্রমাণসহ একটি প্রাথমিক তালিকা প্রশাসনের কাছে জমা দিয়েছি, যাতে অভিযোগগুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তাই যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একটি শক্ত আইনি ভিত্তি তৈরি করতে হবে। আইনি ভিত্তি ছাড়া এগোলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। দাবির প্রতি আমরা আন্তরিক। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণী মহলের সঙ্গে আলোচনা করে একটি রূপরেখা নির্ধারণ করা হবে। এটি আমার একার সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। প্রশাসনের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’