বাড়িতে যাতায়াতের সুবাদে মাদ্রাসাশিক্ষার্থী জামিলা আক্তার সেতুর (১৬) দিকে কুদৃষ্টি পড়ে শরিফুল ইসলাম শরীফের (৩০)। তিনি সম্পর্কে জামিলার বাবার খালাতো ভাই। ঘটনার রাতে শরিফুল ওই বাড়িতে গেলে সুফিয়া বেগম (দাদি) তাঁকে বেরিয়ে যেতে বলেন।
এতে ক্ষুব্ধ হয়ে শরিফুল প্রথমে কাঠের বাটাম দিয়ে দাদির মাথায় আঘাত করলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এ সময় জামিলাকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টায় সে বাধা দিলে তাকেও বাঁশের খাটিয়া ও হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করেন। পরে তাকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে সরিষাখেতের পাশে ধর্ষণ করে মৃত্যু নিশ্চিত করে পালিয়ে যান তিনি।
তদন্ত শুরুর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাবনার ঈশ্বরদীতে চাঞ্চল্যকর দাদি-নাতনি খুনের রহস্য উদ্ঘাটন করে এসব তথ্য জানায় পুলিশ। আজ রোববার বিকেলে পাবনা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন পুলিশ সুপার আনোয়ার জাহিদ।
এর আগে গতকাল শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে শরিফুলকে তাঁর বাড়ি থেকে আটক করে পুলিশ। তিনি ঈশ্বরদী উপজেলার দাশুড়িয়া ইউনিয়নের কালিকাপুর গ্রামের বাসিন্দা। পেশায় তিনি কখনো গাড়ির চালক, কখনো চালকের সহকারীর কাজ করেন।
শরিফুল পুলিশের কাছে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকা, হত্যার কারণসহ বিস্তারিত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। আর সন্দেহভাজন হিসেবে আটক রাব্বি মণ্ডল নামের অপরজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সুপার জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর সুফিয়া বেগম (৬৫) তাঁর ছেলে জয়নাল আবেদীনের সঙ্গে বসবাস করতেন। তাঁর নাতনি জামিলা আক্তার সেতুও একই বাড়িতে বসবাস করত। জামিলা কালিকাপুর দাখিল মাদ্রাসার দশম শ্রেণির ছাত্রী। তার বাবা জয়নাল ঢাকায় থাকেন।
গত শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) রাত ৯টার দিকে জামিলা ও তার দাদি প্রতিদিনের মতো ঘুমিয়ে পড়ে। মধ্যরাতের পর যেকোনো সময় অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তরা সুফিয়া বেগমকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করে মরদেহ বাড়ির প্রবেশমুখে ফেলে রাখে।
এ ছাড়া তাঁর নাতনি জামিলাকে অপহরণের পর ধর্ষণ করে নৃশংসভাবে হত্যা করে বাড়ির পেছনে সরিষাখেতের আইলের ওপর বিবস্ত্র অবস্থায় ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। পরদিন গতকাল সকালে তাদের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে গতকাল রাতে ঈশ্বরদী থানায় হত্যা মামলা করেন নিহত ব্যক্তিদের এক স্বজন। এরপর হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে মাঠে নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক টিম।
পরে স্থানীয় সোর্স ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় আসামি শনাক্ত করে শরিফুল ইসলামকে তাঁর বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। মূলত তাদের তৎপরতায় গতকাল দুপুর থেকে তদন্ত শুরুর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শরিফুল গোয়েন্দা পুলিশকে জানান, সুফিয়া বেগম তাঁর আপন খালা। তিনি তাঁর খালা সুফিয়ার বাড়িতে মাঝেমধ্যে যাতায়াত করতেন। যাতায়াতের সুবাদে সুফিয়ার নাতনি জামিলা আক্তার সেতুর প্রতি তাঁর কুদৃষ্টি পড়ে। কুপ্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি। ঘটনার দিন শরিফুল রাত ১১টার দিকে ওই বাড়িতে প্রবেশ করলে দাদি সুফিয়া বেগম বুঝতে পেরে তাঁকে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলেন।
এতে ক্ষুব্ধ হয়ে শরিফুল কাঠের বাটাম দিয়ে সুফিয়া বেগমের মাথায় আঘাত করলে তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তিনি সেখানেই মারা যান।
তারপর শরিফুল ঘরের ভেতরে গিয়ে জামিলাকে জড়িয়ে ধরলে সে চিৎকার করে। এ সময় শরিফুল বাঁশের খাটিয়া ও হাতুড়ি দিয়ে জামিলার মাথায় আঘাত করলে সে অজ্ঞান হয়ে যায়। রক্তাক্ত অবস্থায় জামিলাকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে যেতে থাকেন শরিফুল। বাড়ির পেছনে পুকুরপাড় দিয়ে যাওয়ার সময় দুজনেই পুকুরে পড়ে যায়। তারপর জামিলাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার সময় তার কাপড় খুলে যায়।
জামিলাকে সরিষাখেতের দিকে নেওয়ার পথে (নির্মাণাধীন বাড়ির পাশে) জ্ঞান ফিরলে সে চিৎকার করলে শরিফুল আবারও হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করেন। এরপর জামিলাকে টেনেহিঁচড়ে সরিষাখেতে নিয়ে ধর্ষণ করে ফেলে রেখে চলে যান। সেখানেই মৃত্যু হয় জামিলা আক্তার সেতুর।
আজ রোববার দুপুরে আটক শরিফুলকে নিয়ে তাঁর দেখানো তথ্যমতে ঘটনাস্থল থেকে হত্যায় ব্যবহৃত একটি হাতুড়ি, একটি বাঁশের খাটিয়া, একটি কাঠের বাটাম ও তাঁর ব্যবহৃত একটি বাটন মোবাইল ফোন জব্দ করে পুলিশ। দায়ের করা মামলায় শরিফুলকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাঁকে আদালতে সোপর্দ করা হবে বলে জানান পুলিশ সুপার।