সমুদ্রে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞার কারণে নোয়াখালীর হাতিয়ায় লক্ষাধিক জেলে বেকার হয়ে পড়েছেন। অনেকে সংসার চালাতে বিভিন্ন জায়গা থেকে ধারদেনা করছেন। তাঁরা বলছেন, সরকারি সহায়তার চাল অল্পসংখ্যক জেলে পেয়ে থাকেন। যেটুকু পান, তা দিয়েও সংসার চালানো কঠিন। আর জেলেদের বড় অংশ তাও পান না। বেকার জেলে পরিবারগুলো অভাব অনটনে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়ছে। তাদের দাবি, মাছ ধরার পেশার সঙ্গে জড়িত জেলে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সবাই যেন সরকারি সহায়তার আওতায় আসেন। সেই সঙ্গে চালের বদলে যেন সহজ শর্তে তাঁদের ঋণের সুবিধা করে দেয় সরকার। যাতে এই সময়ে তাঁরা বিকল্প কোনো কাজের ব্যবস্থা করতে পারেন।
গত ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ৫৮ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা চলছে। নিষেধাজ্ঞার এ সময় সমুদ্রে মাছ ধরা, কেনাবেচা ও পরিবহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আর সরকারি নির্দেশনার প্রতি সম্মান রেখে সমুদ্রে মাছ ধরা থেকে বিরত আছেন দ্বীপের জেলেরা।
উপজেলা মৎস্য অফিস ও স্থানীয় জেলেরা জানান, দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার ছোট-বড় ২০টি ঘাটে মাছ শিকারের কাজ করেন লক্ষাধিক জেলে। কিন্তু সরকারি সহযোগিতা প্রাপ্তির জন্য নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ২৪ হাজার। এর মধ্যে ৪ হাজার ৮০০ পরিবারকে নিষেধাজ্ঞার সময় ৭৭ কেজি করে চাল দেওয়া হবে।
সম্প্রতি হাতিয়ার বুড়িরচরে নতুন সুইজ ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, দুই শতাধিক মাছ ধরার ট্রলার নোঙর করা। এসব ট্রলারের এক একটিতে ২০-২২ জন করে মাঝিমাল্লা রয়েছেন। মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা চলায় সাগরে ট্রলার ভাসছে না। কাজেই এখন সবাই বেকার বসে আছেন। প্রতিদিন সবাই ঘাটে এসে চায়ের দোকানে আড্ডা দিয়ে বাড়ি ফিরে যান। ঘাটের প্রবীণ মাঝি আফছার উদ্দিন বলেন, জেলেদের জন্য সরকারিভাবে যে চাল দেওয়া হয়, তা অতি নগণ্য। হাতিয়াতে জেলে আছেন ১ লাখের বেশি। কিন্তু চাল দেওয়া হয় মাত্র ৫ হাজার পরিবারকে। অন্যরা কিছুই পায় না। তিনি আরও বলেন, চালের বদলে আর্থিক ঋণ দেওয়া হলে তাদের জন্য অনেক ভালো হতো।
একই ঘাটের বাবুল পাটি নামের এক জেলে জানান, নিষেধাজ্ঞার সময় সমুদ্রের কোন এলাকা পর্যন্ত গিয়ে মাছ শিকার করা যাবে, সেটির সুনির্দিষ্ট মাপকাঠি প্রশাসন ঠিক করে দেয়নি। ফলে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে তাঁদের। গত বছর তাঁদের ঘাটের তিনটি ট্রলার কোস্ট গার্ড আটক করে। এ সময় ট্রলারে থাকা বিপুল মাছ প্রশাসন এতিমখানায় বিতরণ করে দেয়। ট্রলারগুলো গভীর সমুদ্রে নয়, বরং উপকূলের কাছাকাছি মাছ শিকার করেছে বলে দাবি করা হলেও প্রশাসন তা শোনেনি।
ট্রলারের মালিক এবং এই পেশার সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরাও আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছেন। জ্বালানিসংকটের পর এখন মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার কারণে কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি এসব ট্রলার নিয়ে সমুদ্রে যেতে পারছেন না তাঁরা। এদিকে ট্রলার তৈরি আর ব্যবসা চালাতে করা ঋণের টাকা পরিশোধের চাপ বেড়ে চলেছে। ট্রলারের মালিক ও ব্যবসায়ীদের দাবি, তাঁদের স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়া হোক।
হাতিয়া ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি রাশেদ উদ্দিন বলেন, নিবন্ধিত জেলেদের মধ্য থেকে নিষেধাজ্ঞা সময়ের জন্য প্রণোদনা হিসেবে চাল বিতরণ করা হয়। প্রায় ১ লাখ জেলের মধ্যে মাত্র ২৪ হাজার নিবন্ধনের আওতায় এসেছেন। বাকি জেলেরা কেন সহযোগিতার বাইরে থাকবেন, সে বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
হাতিয়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ফয়জুর রহমান বলেন, জেলেদের মধ্যে চাল বিতরণের লিখিত নির্দেশনা পেয়েছেন। তাতে ৪ হাজার ৮০০ পরিবারকে ৭৭ কেজি করে চাল দেওয়া হবে। ইতিমধ্যে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভায় জনসংখ্যা অনুপাতে বিভাজন করে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে হরনী ইউনিয়নে চাল বিতরণ করা হয়েছে। অন্যান্য ইউনিয়নে রোববার থেকে বিতরণ করা হবে। সরকারিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা উপস্থিত থেকে তা পর্যবেক্ষণ করবেন। তিনি আরও বলেন, এই নিষেধাজ্ঞা শুধু গভীর সমুদ্রে যাওয়া জেলেদের জন্য। উপকূলের কাছাকাছি জেলেরা মাছ ধরতে পারবেন।