পরীক্ষা ছাড়াই গোপনে দুটি পদে কর্মচারী নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার গোপালঝাড় বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে। চাকরির নামে অর্থ লেনদেনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির তৎকালীন সভাপতি। তবে নিয়োগের অভিযোগকে বানোয়াট দাবি করে প্রধান শিক্ষকের পাল্টা অভিযোগ, বিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট হ্যাক করে জালিয়াতির মাধ্যমে এসব তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। যদিও শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রধান শিক্ষকের নিজস্ব অনলাইন আইডি ও স্বাক্ষর ব্যবহার করেই নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের বেতন-ভাতার বিলের আবেদন সরকারি দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী গোপালঝাড় বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে বর্তমানে প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত রয়েছেন ১৬ জন শিক্ষক ও ৫ জন কর্মচারী।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৩ সালের আগস্ট মাস থেকে বিদ্যালয়টির শূন্য থাকা অফিস সহায়ক ও নৈশ প্রহরী পদে নিয়োগের জন্য পরপর তিনবার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, কোনোবারই নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। সম্প্রতি পরীক্ষা ছাড়াই গোপনে অফিস সহায়ক পদে জাহিদুল ইসলাম এবং নৈশ প্রহরী পদে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির তৎকালীন সভাপতির ভাতিজা সবুজ ইসলামকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে চাকরি পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন নতুন নিয়োগ পাওয়া অফিস সহায়ক জাহিদুল ইসলাম। তবে নৈশ প্রহরী পদে নিয়োগ পাওয়া সবুজ ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেননি।
গোপনে সম্পন্ন হওয়া এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির অন্য সদস্যদের অন্ধকারে রাখা হয়েছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে। ম্যানেজিং কমিটির সদস্য বজলুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরে কমিটির সদস্য হিসেবে আছি। আগের নিয়োগগুলোর বিষয়ে জানতাম। কিন্তু এই দুটি পদে নিয়োগের ব্যাপারে আমাদের কিছুই জানানো হয়নি। আমার কোনো স্বাক্ষরও নেওয়া হয়নি। আমাকে বলা হয়েছিল, আপাতত কোনো নিয়োগ হবে না। নতুন কমিটি গঠনের পর তাদের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হবে। পরে শুনলাম ব্যাকডেটে নাকি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সদস্যদের স্বাক্ষর ছাড়া কীভাবে ব্যাকডেটে নিয়োগ দেওয়া হলো, তা আমাদের বোধগম্য নয়।’
ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এই চক্রের প্রথম শিকার হন গোপালঝাড় গ্রামের বাসিন্দা মো. আলমগীর। অফিস সহায়ক পদে চাকরির আশায় তিনি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও তৎকালীন সভাপতির হাতে কয়েক দফায় ৮ লাখ টাকা তুলে দেন। কিন্তু পরে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই গোপনে অন্য প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হলে প্রতারণার বিষয়টি সামনে আসে।
ভুক্তভোগী মো. আলমগীর বলেন, ‘অফিস সহায়ক পদে চাকরির জন্য জমিজমা বিক্রি ও ধারদেনা করে প্রধান শিক্ষক ও সভাপতির হাতে টাকা তুলে দিয়েছিলাম। আমাকে নিশ্চিত করা হয়েছিল, চাকরিটি আমারই হবে। এমনকি আবেদনের সুবিধার জন্য প্রধান শিক্ষক জালিয়াতির মাধ্যমে আমার জাতীয় পরিচয়পত্রে বয়সও কমিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে জানতে পারি, আমার চেয়েও বেশি টাকার বিনিময়ে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই গোপনে অন্য একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। চাকরির নামে আমার সঙ্গে চরম প্রতারণা করা হয়েছে।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, এ ঘটনায় শিক্ষা অফিসসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিলেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিকার পাননি।
চাকরিপ্রত্যাশীর কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির তৎকালীন সভাপতি ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মো. নুরুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আট লাখ নয়, চাকরির কথা বলে আলমগীরের কাছ থেকে প্রধান শিক্ষক ও আমি আড়াই লাখ টাকা নিয়েছিলাম। পরে যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আলমগীরকে লাভসহ তার পাওনা টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।’
একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, নিয়োগ-সংক্রান্ত ওই টাকার একটি অংশ শিক্ষা অফিসসহ সংশ্লিষ্টদেরও দিতে হয়েছে।
তবে নিয়োগ ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. হামিদুর রহমান। তাঁর দাবি, ‘কোনো নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট হ্যাক করে একটি চক্র জালিয়াতির মাধ্যমে এসব তথ্য ছড়াচ্ছে।’
প্রধান শিক্ষকের এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে নাকচ করেছেন শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা। জলঢাকা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আশরাফ-উজ-জামান সরকার বলেন, ‘প্রধান শিক্ষকের দাবি সম্পূর্ণ বানোয়াট। তিনি নিজেই অফিসে এসে ওই দুই পদে নিয়োগপ্রাপ্তদের বেতন-ভাতার বিল পাঠানোর সুপারিশ করেছিলেন।’
এ বিষয়ে নীলফামারী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ‘নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের নিজস্ব অনলাইন আইডি ও স্বাক্ষর ব্যবহার করেই বেতন-ভাতার বিলের আবেদন পাঠানো হয়েছে। তাই এই নিয়োগ অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’