স্ত্রী কবিতা আক্তার, ১৬ মাস বয়সী মেয়ে নওশীন নাঈম নুসাইবা ও মা ফাতেমা বেগমকে নিয়ে নাঈমের সুখের সংসার। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করায় নিজ বাড়িতে ঠাঁই না হওয়ায় মোংলার কুমারখালি গ্রামের শিকারি মোড় এলাকায় পরিবারসহ ভাড়া থাকতেন নাঈম।
গত বুধবার বাড়ি থেকে গাড়ি চালানোর উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময় স্ত্রী ও মেয়েকে বলেছিলেন বাড়ি ফিরে সবার জন্য ঈদের কেনাকাটা করবেন। কিন্তু বাড়ি ঠিকই নাঈম ফিরেছেন, তবে লাশ হয়ে।
গত বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বিকেলে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের বেলাই ব্রিজ এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নববধূ-বর ও তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে মারা যান মাইক্রোবাসচালক মো. নাঈম শেখ। পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে ঘোর অমানিশার মধ্যে পড়েছে পরিবারটি। স্বাভাবিকভাবে বাঁচার জন্য বিত্তবানদের সহযোগিতা চেয়েছে নাঈমের পরিবার।
মাইক্রোবাসচালক মো. নাঈম রামপাল উপজেলার জিগিরমোল্লা গ্রামের মনিরুল ইসলামের ছেলে। ২০১৯ সালে মোরেলগঞ্জ উপজেলার শনিরজোর গ্রামের কবির হোসেনের মেয়ে কবিতা আক্তারকে বিয়ে করেন তিনি। বিয়ের পরে কবিতাকে পড়াশোনা করিয়েছেন নাঈম। সরকারি প্রফুল্ল চন্দ্র (পিসি) কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক (সম্মান) পাস করা কবিতা স্বামীকে সহযোগিতা করার জন্য মোংলা ইপিজেডে একটি কোম্পানিতে শ্রমিকের কাজ করেন। কিন্তু একার আয়ে কি আর সংসার চলে!
সরেজমিনে দেখা যায়, ভাড়া বাড়ির উঠানে বালু নিয়ে খেলা করছে নাঈমের একমাত্র মেয়ে নুসাইবা। মাঝে মাঝে মায়ের কোলে উঠে বাবার কথা জানতে চাচ্ছে। সে এখনো বোঝে না, তার বাবা আর ফিরে আসবে না। নাঈমের স্ত্রী কবিতা ও তাঁর মা এবং নাঈমের শ্বশুরবাড়ির কিছু লোকজন বাড়িতে অবস্থান করছেন। কবিতার চোখে এখন আর পানি নেই। বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন স্বামীকে হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে গেছেন।
নাঈমের স্ত্রী কবিতা বলেন, ‘আমাদের ফ্যামিলিতে আমি, আমার স্বামী, আমার একটা মেয়ে আছে ১৬ মাস বয়স আর আমার শাশুড়ি, আমরা মোংলায় ভাড়া বাসায় থাকি। আমাদের নিজেদের বলতে কোনো জমি নেই। আমার শ্বশুর দ্বিতীয় বিবাহ করার কারণে আমার শাশুড়িকে দেখেন না, শাশুড়ি আমাদের সঙ্গে থাকেন। আমার সংসারে ঘরের ভেতরে ও বাইরে উপার্জন করার মতো ছিল আমার স্বামী, কিন্তু আল্লাহ তাকে নিয়ে গেছে। এখন আমার সংসারে আয় করার মতো আর কেউ নেই। আমার স্বামী আমাকে লেখাপড়া শিখিয়েছে। কিন্তু এখন আমার সংসার দেখার মতো কেউ নেই। আমার বাচ্চা, শাশুড়ি ও নিজের ভরণপোষণ চালানোর জন্য সব দায়িত্ব এখন আমার ওপর পড়েছে। সরকার এবং সবার কাছে অনুরোধ করব, দয়া করে আমাকে কোনো একটা ভালো চাকরির ব্যবস্থা করে দিন। তাহলে আমার এই মাসুম বাচ্চাটাকে আমি মানুষ করতে পারব, লেখাপড়া শিখিয়ে তাকে শিক্ষিত করতে পারব।’
নাঈমের স্বজনেরা জানান, নাঈমের পরিবারে আর কেউ নেই আয় করার মতো। নাঈমের স্ত্রী লেখাপড়া জানেন। সরকার যদি তাঁকে কোনো কাজের ব্যবস্থা করে দিত, তাহলে পরিবারটা খেয়ে-পরে বাঁচতে পারত।
নাঈমের দাদি জাহানারা বেগম বলেন, ‘আমার নাতি ছোটকাল থেকেই কষ্ট করে মানুষ হয়েছে। আমি কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। মোংলায় বাসা ভাড়া করে মা, বউ, বাচ্চা নিয়ে থাকত। অন্যের মাইক্রোগাড়ি ভাড়া নিয়ে জীবন চালাত।’ তারা কীভাবে চলবে, তাদের সংসার কে চালাবে—বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
নাঈমের ছোট চাচি আজমিরা বেগম বলেন, ‘নাঈম ড্রাইভারি করে টাকা ইনকাম করত, সেই টাকা দিয়ে সংসার চালাত। নাঈমের মা, স্ত্রী ও মেয়েটা খুবই অসহায় হয়ে পড়েছে। কে দেখবে এখন ওদের। ওদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই, নাঈমের বউ কবিতা লেখাপড়া জানে। ওকে যেন একটা ভালো কাজের ব্যবস্থা করে দেয়, যাতে মেয়েটাকে নিয়ে বাকি জীবন কাটাতে পারে।’