কাঁধে স্ত্রীর, বুকে ছেলের লাশ
‘ঈদের (ঈদুল আজহা) আগের দিন রাতে আমার স্ত্রী সাথী বেগম (২৭) এবং দেড় বছরের ছেলে সাফওয়ান ওরফে হাসেম ট্রেন দুর্ঘটনায় মারা যায়। তখন দুই লাশ এবং জীবিত সন্তানকে নিয়ে আমাকে একাই রেললাইন পার হতে হয়েছে। কাঁধে ছিল স্ত্রীর এবং বুকে ছিল সন্তানের লাশ; অন্য হাতে ছিল আমার আরেক মেয়ে এবং শপিং ব্যাগ। কিন্তু আমাকে সাহায্য করার মতো একজন মানুষও পাইনি। সবাই শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে ভিডিও আর টিকটক করছিল।’
গতকাল রোববার কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন সুজন মিয়া। গত ২৭ মে নরসিংদী রেলস্টেশনে ঢাকাগামী আন্তনগর কক্সবাজার এক্সপ্রেসের ধাক্কায় স্ত্রী ও সন্তান হারান তিনি। সুজন বলেন, ‘ট্রেন আসার সময় আমরা বুঝতে পারিনি। ট্রেনটি কাছে আসতেই আমি চিৎকার করে উঠি। আমার স্ত্রী বাচ্চাদের নিয়ে দৌড় দিয়েছিল, কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি।’
সুজন মিয়া আরও বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ। পরিবার বলতে ছিল স্ত্রী, দুই ছেলে-মেয়ে। এখন আমার এক মেয়ে ছাড়া আর কেউ নেই। যখন আমার স্ত্রী ও সন্তানের লাশ কাঁধে করে নিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী বস্তু বহন করছি। হায় আল্লাহ, আমার কী সর্বনাশ হলো! যেখানে শপিং ব্যাগ নিয়ে বাড়ি ফেরার কথা, সেখানে ফিরতে হলো প্রিয়জনদের লাশ নিয়ে।’
কান্নায় ভেঙে পড়ে সুজন বলেন, ‘আমার স্ত্রী-সন্তান ছাড়া আমি বাঁচতাম না। আমার মেয়েটা মা ছাড়া রাতে থাকতে পারে না। আমার স্ত্রী আমাকে নিয়ে চলে যেত, কিন্তু ছেলেটাকে রেখে যেত। আমার মেয়েটা এখনো মাকে খুঁজে বেড়ায়।’
এদিকে ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
নেটিজেনদের অনেকে লিখেছেন, ‘একজন মানুষ দুটি লাশ নিয়ে যাচ্ছে, আর সবাই ছবি ও ভিডিও ধারণে ব্যস্ত।
এমন একজনও কি ছিল না তাঁকে সাহায্য করার? স্ত্রী ও সন্তানকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য অন্তত পাশে দাঁড়ানোর?’ কারও কারও মন্তব্য, ‘লোকটিকে সাহায্য না করে মোবাইলে ভিডিও ধারণ করা মানুষের বিকৃত মানসিকতার পরিচয়।’
প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুর্ঘটনার পরপরই শত শত মানুষ ঘটনাস্থলে জড়ো হয়। কিন্তু সাহায্যের জন্য তেমন কেউ এগিয়ে আসেনি। অধিকাংশই ভিডিও ধারণে ব্যস্ত ছিল। এমনকি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকেও তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যায়নি।
নরসিংদী রেলওয়ে ফাঁড়ির ইনচার্জ দিলীপ কুমার বলেন, ‘একটি ট্রেন প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছিল। তারা রেললাইন পার হওয়ার সময় দ্রুতগতির কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেনটি এসে পড়ে। আমরা খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি, লাশ নেই। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, তাদের নরসিংদী জেলা হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। পরে পরিবারের অনুরোধে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ হস্তান্তর করা হয়।’
জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া বলেন, ‘আমরা এখনো বিষয়টি সম্পর্কে তেমন কিছু শুনিনি। ঈদের ছুটির কারণে হয়তো বিষয়টি আমাদের নজরে আসেনি। যতটুকু সম্ভব আর্থিক সহায়তাসহ যেকোনো বিষয়ে ওই পরিবারকে সহযোগিতা করা হবে।’