নরসিংদীতে ছাত্রীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়ানোর জেরে আবদুল্লাহ আলী (২৮) নামের এক কলেজশিক্ষক আত্মহত্যা করেছেন। গতকাল বুধবার রাত ১২টার দিকে সদর উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নের মৌলভীপাড়া এলাকার বাড়ি থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় ঘটনাস্থলে থাকা ওই ছাত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।
আবদুল্লাহ আলী নরসিংদী মডেল কলেজের রসায়ন বিভাগের প্রভাষক ও সদর উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নের মৌলভীপাড়া এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। তাঁর ঘরে পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী সিরাতুন নাহার ও চার বছর বয়সী ছেলে সন্তান রয়েছে। অন্যদিকে ওই ছাত্রী একই কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুই বছরের প্রেমের সম্পর্কের পরিণতি হিসেবে ২০১৭ সালে পারিবারিকভাবে বিয়ে করেন আবদুল্লাহ আলী ও সিরাতুন নাহার। পরের বছরই তাঁদের সংসারে এক ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। গত বছর একই কলেজের এক ছাত্রীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন ওই শিক্ষক। অপ্রকাশ্য এই সম্পর্কের কথা তাঁর স্ত্রী জানতে পারেন চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে। এ নিয়ে তিনজনের মধ্যেই দ্বন্দ্ব চলছিল।
ঘটনাস্থলে পৌঁছার পর পুলিশ মৃতের স্ত্রী ও ওই ছাত্রীর কাছে ঘটনার বিষয়ে জানতে চায়। এ সময় পুলিশ সদস্যদের কাছে তাঁরা ঘটনার বিস্তারিত খুলে বলেন। সেখানে উপস্থিত থাকা কয়েকজন তাঁদের বরাত দিয়ে এই প্রতিবেদককে জানান, চলতি মাসের ৬ তারিখে আবদুল্লাহ আলীর স্ত্রী সিরাতুন নাহার জানতে পারেন ওই ছাত্রীর সঙ্গে শিক্ষকের সম্পর্ক আছে। গত এক সপ্তাহ আগে এই তিনজন একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেন, সিরাতুন নাহার তাঁর স্বামী আবদুল্লাহকে ডিভোর্স দেবেন। অন্যদিকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশের পর ওই ছাত্রীকে বিয়ে করবেন আবদুল্লাহ। এরপর থেকে সিরাতুন নাহার ছেলেকে নিয়ে রায়পুরায় বাপের বাড়িতে ছিলেন।
পুলিশের কাছে দেওয়া ওই ছাত্রীর ভাষ্য, গত মঙ্গলবার ছিল তাঁর জন্মদিন। এ উপলক্ষে তাঁর কয়েকজন সহপাঠীকে নিয়ে স্থানীয় একটি রেস্টুরেন্টে কেক কাটেন আবদুল্লাহ। পরে তাঁকে বাড়ি ফিরে যেতে বলা হলেও তিনি তা না করে ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যান। এ নিয়ে তাঁর প্রতি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ ছিলেন আবদুল্লাহ। পরদিন সকালে আবদুল্লাহ ‘I am Destroying myself’ লিখে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে একটি স্টোরি দেন।
দুপুরে তাঁদের মধ্যে কথা হলে আবদুল্লাহ বলেন, ‘যা হইছে হইছে, তুমি আর আমার বাসায় আইসো না, লোক জানাজানি করারও দরকার নেই। আমি নিজেকে শেষ করে দিচ্ছি।’ পরে সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরে স্ত্রী ও ছাত্রীকে একটি এসএমএস পাঠান আবদুল্লাহ।
এদিকে দরজা ভেঙে ওই কক্ষে প্রবেশের পর পুলিশ আসার মধ্যবর্তী সময়ে মৃত ব্যক্তি, তাঁর স্ত্রী ও ওই ছাত্রীর তিনটি মোবাইল চুরি হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। কান্নাকাটির মধ্যে কে এই ঘটনা ঘটিয়েছেন তা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, ওই ছাত্রীর কাছের কেউ ঘটনাস্থলে আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই মোবাইল তিনটি কৌশলে লুকিয়ে ফেলেছেন। সকল প্রমাণ নষ্ট করে দেওয়ার জন্যই এই কাজটি করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে মোবাইল তিনটি উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ।
নরসিংদী মডেল কলেজের অধ্যক্ষ কামরুল ইসলাম বলেন, ‘রসায়নের শিক্ষক আবদুল্লাহ আলী একজন জনপ্রিয় শিক্ষক ছিলেন। তাঁর এমন মৃত্যুতে আমরা কলেজ পরিবার শোকাহত। আমাদের কলেজেরই এক ছাত্রীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। তাকে (ছাত্রীকে) জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়ার কথা শুনেছি। এই বিষয়ে আজই আমরা একটি মিটিং করে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করব।’
এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) ফারিয়া আফরোজ বলেন, ‘এক শিক্ষকের আত্মহত্যার খবর পেয়ে বুধবার রাত ১২টার দিকে ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে নরসিংদী সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ওই ছাত্রী আমাদের কাছে তাদের সম্পর্ক থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। অধিকতর তদন্তের স্বার্থে ওই ছাত্রীকে আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’