নরসিংদীর মাধবদীতে ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় বাবার সামনে থেকে কিশোরীকে অপহরণ করে হত্যার ঘটনায় নিহত কিশোরীর মা বাদী হয়ে মাধবদী থানায় ৯ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন। এরপর রাতেই অভিযান চালিয়ে ইউনিয়ন বিএনপির এক নেতা ও তাঁর ছেলেসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
কিশোরীর (১৫) বাড়ি বরিশালে। মাধবদীর বিলপাড় এলাকায় ভাড়া বাসায় মা-বাবার সঙ্গে সে থাকত। তার বাবা ও ভাই স্থানীয় একটি টেক্সটাইল মিলের শ্রমিক।
নিহত কিশোরীর পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ১৫ দিন আগে স্থানীয় বখাটে নূর মোহাম্মদ নূরার নেতৃত্বে পাঁচ-ছয়জন তরুণ কিশোরীকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করেন। ওই ঘটনার বিচারের জন্য কিশোরীর পরিবার স্থানীয় মহিষাশুড়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য ও ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আহম্মদ আলী দেওয়ানের কাছে যান।
পরিবারের অভিযোগ, সাবেক ওই ইউপি সদস্য বিচার না করে উল্টো অপরাধীদের সঙ্গে রফাদফা করে অর্থ আত্মসাৎ করেন এবং কিশোরীর পরিবারকে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। বিচার না করায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
এই পরিস্থিতিতে গত বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) রাতে কিশোরীকে তার খালার বাড়িতে রেখে আসতে যাচ্ছিলেন বাবা। পথে বিলপাড় এলাকায় পৌঁছালে নূরার নেতৃত্বে ছয় তরুণ পথরোধ করে বাবার সামনে থেকেই তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। রাতভর খোঁজাখুঁজির পর গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে বিলপাড় ও দড়িকান্দী এলাকার একটি সরিষাখেতে কিশোরীর নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় লোকজন। তার গলায় ওড়না প্যাঁচানো ছিল। পরে পুলিশ কিশোরীর লাশ উদ্ধার করে।
এই ঘটনায় নিহত কিশোরীর মা বাদী হয়ে স্থানীয় মেম্বার ও বিএনপি নেতাসহ ৯ জনকে আসামি করে মামলা করেন।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, অপহরণ ও ধর্ষণের ঘটনায় বিচার চেয়ে কিশোরীর পরিবার স্থানীয় মহিষাশুড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য ও ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আহম্মদ আলী দেওয়ানের কাছে বিচার চেয়েছিল। কিন্তু সেখানে সুষ্ঠু বিচার না পেয়ে, উল্টো হুমকির মুখে পড়ে পরিবারটি। গ্রাম্য মাতবরদের কাছে অভিযোগ করায় অভিযুক্ত নূরা ও তাঁর সহযোগীরা কিশোরীর পরিবারের ওপর ক্ষুব্ধ হন।
নিরাপত্তাহীনতার কারণে কিশোরীকে তার খালার বাড়িতে রেখে আসার জন্য বৃহস্পতিবার রাতে রওনা দেন তার বাবা। পথে বিলপাড় এলাকায় পৌঁছালে নূরার নেতৃত্বে ছয়জন বখাটে পথরোধ করে বাবার সামনে থেকেই কিশোরীটিকে তুলে নিয়ে যায়। স্বজনেরা সারা রাত বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালিয়েও তার কোনো হদিস পাননি। পরদিন বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বিলপাড় ও দড়িকান্দী এলাকার মাঝামাঝি একটি সরিষাখেতে কিশোরীর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় লোকজন পুলিশে খবর দেয়। খবর পেয়ে মাধবদী থানা-পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে।
মামলার পরে পুলিশ দ্রুত অভিযানে নামে। পুলিশ অভিযান চালিয়ে এজাহার নামীয় পাঁচ আসামিকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার আসামিরা হলেন সাবেক ইউপি সদস্য ও ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আহম্মদ আলী দেওয়ান (৬৫), আহম্মদ আলীর ছেলে ইমরান দেওয়ান (৩২), মো. এবাদুল্লাহ (৩৫), আইয়ুব আলী (৩০) ও মো. গাফফার (৩৭)।
মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন বলেন, নিহত কিশোরীর মা ৯ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন। পাঁচজনকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রধান আসামি নূরাকে গ্রেপ্তারে পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে।
নরসিংদীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন চন্দ্র সরকার জানিয়েছেন, ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ নরসিংদী সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেলে ধর্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।
এদিকে নরসিংদী সদর আসনের সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন এক ফেসবুক পোস্টে এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।