ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন আরও চার শিশু মারা গেছে। এ নিয়ে চলতি বছর হামের প্রাদুর্ভাবে হাসপাতালটিতে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৮ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ১৬ শিশু ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৯৬ শিশু।
মারা যাওয়া চার শিশুর মধ্যে একজন ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার শাপলা বাজার এলাকার চার মাস বয়সী কন্যাশিশু।
১৮ জুন হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর শুক্রবার দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে তার মৃত্যু হয়। হাসপাতালের মৃত্যু সনদে উল্লেখ করা হয়েছে, হামের পাশাপাশি শিশুটি নিউমোনিয়া ও হৃদ্যন্ত্রের জটিলতায় আক্রান্ত ছিল।
অপর তিন শিশুর মধ্যে একজন ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার পলাশকান্দা এলাকার চার মাস বয়সী ছেলেশিশু। ২ জুন হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে তার মৃত্যু হয়। এ ছাড়া নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার মাইশারচর এলাকার চার মাস বয়সী এক ছেলেশিশু ১৬ জুন হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর শুক্রবার বেলা ৩টার দিকে মারা যায়। অন্যদিকে সুনামগঞ্জের মদনপুর এলাকার আট মাস বয়সী এক ছেলেশিশু ৮ জুন হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর শুক্রবার রাত ৮টার দিকে মৃত্যুবরণ করে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হামের লক্ষণ নিয়ে নতুন করে ১৬ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ মার্চ থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে ২ হাজার ৩৭৮ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ২ হাজার ২২৬ জন। মারা গেছে ৫৮ শিশু। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৯৬ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় কোনো শিশুকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি এবং কাউকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায়ও পাঠাতে হয়নি।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এক-দুজন করে হামের লক্ষণ নিয়ে শিশু ভর্তি হতে শুরু করলেও মার্চের মাঝামাঝি থেকে রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতালের শিশু বিভাগের অধীনে ৬৪ শয্যাবিশিষ্ট পৃথক হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়।
শিশুকে নিয়ে আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা সাবিনা আক্তার বলেন, ‘হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রথম দিনই আমার চোখের সামনে চারটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একজন মা হিসেবে আমি চরম আতঙ্কের মধ্যে আছি। আমার পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে ফাতেমা আক্তারও এখানে ভর্তি রয়েছে। তার অবস্থাও ভালো নয়, দিন দিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। প্রতিদিনই হাসপাতালে একজন বা দুজন শিশুর মৃত্যুর খবর শুনছি। এভাবে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। এত বড় একটি হাসপাতালে শিশুদের জন্য পিআইসিইউ (পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) সুবিধা নেই। প্রয়োজনীয় পিআইসিইউ ব্যবস্থা থাকলে হয়তো আরও কিছু শিশুর প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হতো। সরকারের কাছে আমার অনুরোধ, দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও পর্যাপ্ত পিআইসিইউ সুবিধা নিশ্চিত করা হোক। একজন অসহায় মা হিসেবে আমি এখন কী করব, কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।’
হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডের ফোকাল পারসন মো. ওমর ফারুক বলেন, কয়েক সপ্তাহ আগের তুলনায় বর্তমানে রোগীর চাপ ধীরে ধীরে কমছে। প্রতিদিন নতুন রোগী ভর্তি হওয়ার সংখ্যা কমেছে এবং অনেক শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছে। পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। তাই অভিভাবকদের আরও সতর্ক থাকতে হবে। শিশুদের মধ্যে হামের লক্ষণ দেখা দিলেই দ্রুত হাসপাতালে এনে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।
ওমর ফারুক আরও বলেন, ‘হাসপাতালে নবজাতকদের উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে অত্যাধুনিক এনআইসিইউ (নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট) সরঞ্জাম ইতিমধ্যে এসে পৌঁছেছে। শিগগিরই এসব যন্ত্রপাতি স্থাপন ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষ করে পূর্ণাঙ্গভাবে সেবা চালু করা হবে। এনআইসিইউ চালু হলে সংকটাপন্ন নবজাতকদের আরও আধুনিক ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হবে, যা শিশুমৃত্যুর হার কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ডা. মো. ওমর ফারুক আরও বলেন, যারা মারা যাচ্ছে, তারা হামের পাশাপাশি অন্য রোগেও আক্রান্ত।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন খান বলেন, এক দিনে সর্বোচ্চ চার শিশুমৃত্যুর ঘটনায় মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান খোরশেদ আলমকে প্রধান করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেই কমিটিকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যুর কারণের প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।