অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ ও প্রবাসী অধ্যুষিত জেলা হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজার। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, জেলার প্রায় দুই লাখ মানুষ বৈধভাবে বিদেশে অবস্থান করছেন। চা শিল্প, পর্যটন খাত ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে সমৃদ্ধ এ জেলায় সবচেয়ে নাজুক অবস্থা চিকিৎসাসেবার। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি কিংবা বেসরকারি—কোথাও মানসম্মত চিকিৎসা নেই। প্রসূতিদের সিজার ছাড়া কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা প্রায় অনুপস্থিত।
প্রায় ২২ লাখ মানুষের এই জেলায় স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও গড়ে ওঠেনি আধুনিক ও বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থা। জেলা সদরের ২৫০ শয্যার হাসপাতাল থেকে শুরু করে উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও সীমিত চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। রোগীদের সামান্য জটিলতা দেখা দিলেই পাঠানো হচ্ছে সিলেটে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে নেই আইসিইউ, সিসিইউ, সিটি স্ক্যান, ইকো কিংবা হৃদরোগের চিকিৎসাসেবা। চিকিৎসক সংকটও প্রকট। অনেক রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েই রেফার করা হচ্ছে বিভাগীয় শহরে।
উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর অবস্থাও নাজুক। কোথাও যন্ত্রপাতি থাকলেও নেই টেকনোলজিস্ট, আবার কোথাও অপারেশন থিয়েটার থাকলেও নেই চিকিৎসক। ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
এদিকে জেলা শহরের অলিগলিতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই মূলত প্রসূতিদের সিজার করাকেই ব্যবসা হিসেবে নিয়েছে। ১৭ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত প্যাকেজে সিজার করানো হচ্ছে। রোগী সংগ্রহে ইউনিয়ন পর্যায়ে দালাল বা প্রতিনিধি নিয়োগের অভিযোগও রয়েছে।
সচেতন নাগরিক আবুল কালাম, জুয়েল চৌধুরী ও আব্দুল আহাদ বলেন, মৌলভীবাজারে চিকিৎসাসেবার সংকটই সবচেয়ে বড় সংকট। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেই, বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে তো সেবা নয়, চলছে বাণিজ্য। অনেক মানুষ সাধারণ চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছেন।
কমলগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা কাওছার আহমেদ বলেন, “আমার মাকে জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল। কিন্তু দুই দিনেও রোগ শনাক্ত করতে পারেনি। পরে বাধ্য হয়ে সিলেটে নিয়ে যেতে হয়েছে।”
রোগী মাহবুবা আক্তার বলেন, “শুধু অক্সিজেন সাপোর্টের জন্য আমাদের সিলেটে যেতে হয়েছে। জেলায় একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল খুব প্রয়োজন।”
রাজনগরের মনাফ মিয়া জানান, তাঁর নবজাতক সন্তানের জন্মের পর জটিলতা দেখা দিলে সদর হাসপাতাল থেকে সিলেটে পাঠানো হয়। পরে চিকিৎসকরা জানান, জন্মের সময় শিশুর মাথায় আঘাত লেগেছিল।
মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. প্রণয় কান্তি দাশ বলেন, “আইসিইউ, সিসিইউ, সিটি স্ক্যান, ইকো ও হৃদরোগ চিকিৎসাসেবা চালুর জন্য নিয়মিত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি পাঠানো হচ্ছে।”
এ বিষয়ে সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান বলেন, “জেলায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট রয়েছে। বিত্তবান ও প্রবাসীদের ব্যক্তি উদ্যোগে আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসা প্রয়োজন। তাহলে রোগীদের সিলেটমুখী হওয়া কমবে।”