মেহেরপুরের গাংনীতে গাছে গাছে শোভা পাচ্ছে মৌসুমের রসালো ফল লিচু। আশানুরূপ ফলন হওয়ায় সন্তুষ্ট বাগানমালিকেরা। ধীরে ধীরে বড় হয়ে লাল আভা ধারণ করেছে লিচুগুলো। ইতিমধ্যে বাজারেও উঠতে শুরু করেছে মৌসুমের এ জনপ্রিয় ফল। আর কয়েক দিন পরই বাজার ভরে যাবে লাল টুকটুকে লিচুতে।
অনেক ব্যবসায়ী আগাম টাকা দিয়ে বাগান কিনে রেখেছেন। প্রায় প্রতিটি গাছেই দেখা যাচ্ছে ফলের সমারোহ। গাছগুলো যেন সেজেছে অপরূপ সৌন্দর্যে। এমন দৃশ্য চোখে পড়েছে গাংনী উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বাগান, রাস্তার পাশ ও আবাদি জমিতে।
সরেজমিন গাংনী উপজেলা চত্বর, বামন্দী, তেরাইল, জোড়পুকুর, তেঁতুলবাড়িয়া, ঝোড়াঘাট, গরীবপুরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বাগান, বাড়ির আঙিনা ও রাস্তার পাশের গাছে গাছে ঝুলছে লাল টুকটুকে রসালো লিচু।
তবে অধিক লাভের আশায় অনেক সময় অপরিপক্ব লিচু বাজারে বিক্রি করতে দেখা যায়। পাকা ও আধা পাকা অবস্থায় পাইকারি বাজারে লিচু নিয়ে আসছেন বিক্রেতারা। আবার অনেক বাগানমালিক সরাসরি ব্যবসায়ীদের কাছে বাগান বিক্রি করে দিচ্ছেন। ব্যবসায়ীরা এসব লিচু মেহেরপুরের বিভিন্ন বাজার ছাড়াও ট্রাকভর্তি করে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠাচ্ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিপক্ব হওয়ার আগেই লিচু বাজারে আসায় প্রকৃত স্বাদ পাওয়া যায় না। বেশি লাভের আশায় অপরিপক্ব লিচু না তোলাই ভালো বলে মনে করেন তারা। তবে এখন গাংনীর বাজারে তুলনামূলক ভালো মানের লিচু পাওয়া যাচ্ছে।
বাজারে লিচু কিনতে আসা শাহারুল ইসলাম বলেন, ‘বাজারে নতুন ফল এসেছে, তাই ছেলে-মেয়েদের জন্য কিনছি। তবে এখনো স্বাদ পুরোপুরি আসেনি। আরও কিছুদিন গাছে থাকলে লিচু আরও মিষ্টি ও সুস্বাদু হতো। কিছু অসাধু বাগানমালিক আগেই অপরিপক্ব লিচু বিক্রি করে দিয়েছেন। এতে ব্যবসায়ী ও মালিক লাভবান হলেও ঠকেছেন ক্রেতারা। তবে এখন মোটামুটি ভালো লিচু পাওয়া যাচ্ছে। আর ৮ থেকে ১০ দিন পর বোম্বাই ও চায়না থ্রি লিচু বাজারে এলে চাহিদা আরও বাড়বে।’
ক্রেতা সাঈদ আহমেদ বলেন, ‘এবার লিচুর দাম কিছুটা বেশি। ৮০টি লিচু বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়। সে হিসাবে প্রতিটি লিচুর দাম পড়ছে প্রায় ৩ টাকা। দাম বেশি হলেও মৌসুমি ফল হিসেবে মানুষ কিনছেন। তবে আঁটির আকার তুলনামূলক বড় হওয়ায় বেশি নেওয়া হয়নি। বোম্বাই ও চায়না থ্রি উঠলে আরও কিনব।’
বামন্দী বাজারের লিচু ব্যবসায়ী বাদশা মিয়া বলেন, ‘এখন মুজাফফর লিচুর ভালো স্বাদ পাওয়া যাচ্ছে। বোম্বাই লিচু বাজারে আসতে আরও ৮ থেকে ১০ দিন লাগবে। আর চায়না থ্রি আসতে লাগবে প্রায় ১৫ দিন। বর্তমানে ৮০টি মুজাফফর লিচু ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বেচাকেনাও ভালো।’
গাংনী বাজারের ব্যবসায়ী সজীব হোসেন বলেন, ‘বাজারে এখন পরিপক্ব মুজাফফর লিচু আসতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে বোম্বাই ও চায়না থ্রি লিচুও বাজারে উঠবে। তখন দাম কিছুটা কমতে পারে।’
ঝোড়াঘাট গ্রামের লিচুচাষি লিটন মালিথা জানান, গত বছরের তুলনায় এবার গাছে লিচুর ফলন বেশি হয়েছে। তবে অতিরিক্ত রোদের কারণে কিছু লিচু ঝরে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘গত বছর বাগানের লিচু বিক্রি করেছিলাম ১৪ হাজার টাকায়, আর এবার বিক্রি করেছি ৫৭ হাজার টাকায়। এটি আমার বোম্বাই লিচুর বাগান।’
তিনি আরও বলেন, ‘কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও মালিক বেশি লাভের আশায় আগেই লিচু বিক্রি করে দিয়েছেন। সেই লিচুগুলো বাজারে উঠলেও স্বাদ ছিল টক।’
গাংনী উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর উপজেলায় ১২৫ হেক্টর জমিতে লিচুর চাষ হয়েছে। সম্ভাব্য উৎপাদন ধরা হয়েছে ১ হাজার ৪৬২ টন।
গাংনী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মতিয়র রহমান বলেন, ‘লিচুর গুণগত মান ধরে রাখতে আরও কিছুদিন পর বাজারজাত করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে মুজাফফর লিচু বাজারে পাওয়া যাচ্ছে এবং তা পরিপক্ব। বোম্বাই লিচু ৮ থেকে ১০ দিন পর এবং চায়না থ্রি ১৩ থেকে ১৫ দিন পর বাজারে আসবে। গত সপ্তাহেও কিছু অপরিপক্ব লিচু বাজারে উঠেছিল, যার স্বাদ ভালো ছিল না।’
গাংনী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘অপরিপক্ব লিচু বিক্রি না করতে ব্যবসায়ী ও বাগানমালিকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’