বাড়িটির কোনো নাম নেই। নেই তার পুরোনো জৌলুশ, ঝাঁ-চকচকে ভাব। মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়নের টুবিয়া গ্রামে ৩০০ বছর ধরে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে এই দারোগা বাড়িটি। কালের সাক্ষী এই ভগ্নপ্রায় বাড়ির দেয়াল বেয়ে এখন উঠে গেছে বট, অশ্বত্থের গাছ। দরজা, জানালার পাল্লা খুলে পড়েছে, খসে গেছে পলেস্তারা। তারপরও ব্রিটিশ আমলে নির্মিত বাড়িটি এর কাঠামো, নকশা আর পরিবেশের কারণে এখনো ভ্রমণপ্রেমী আর ইতিহাসপ্রিয় মানুষদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম।
এলাকায় ভূতের বাড়ি নামে পরিচিত এই পরিত্যক্ত বাড়িটি একটু যত্ন আর সংস্কারের ছোঁয়ায় হয়ে উঠতে পারে দর্শনীয় স্থান। এতে সরকারের রাজস্ব আয় যেমন বাড়বে, তেমনি বাড়বে এলাকায় পর্যটনের ক্ষেত্র ও সম্ভাবনা।
জানা যায়, সুজয় সারেং নামে এক হিন্দু দারোগা এই বাড়িটি নির্মাণ করেন ব্রিটিশ আমলে। একটি দোতলা ঘর ও একটি বৈঠকখানা ঘর নির্মাণ করা হয়। এ ছাড়া বাড়ির চারপাশে প্রায় পাঁচ একর জমির ওপরে নানা ফল ও ফুলের গাছ লাগানো হয়। বাড়ির পাশে পুকুর নির্মাণ করে সেখানে ঘাট বাঁধানো হয়। ওই সময় এলাকায় তাঁকে অনেকেই জমিদার হিসেবেও মানতেন। সুজয় সারেংয়ের বংশধরেরা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে চলে যান। এরপর তাঁর বংশের কেউ কখনো এখানে আসেননি।
পরবর্তীকালে হাসেন মাতুব্বর নামে একজন এখানে বসবাস শুরু করেন। তিনি মারা যাওয়ার পর তাঁর ছেলে বাদশাহ মাতুব্বর এই বাড়িতে স্ত্রী রিজিয়া বেগম ও সন্তানদের নিয়ে বসবাস করতেন। বর্তমানে বাড়িটি বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ায় পাশেই তাঁরা টিন দিয়ে ঘর নির্মাণ করে সেখানে থাকছেন।
রিজিয়া বেগম বলেন, ‘প্রায় ৫০ বছর আগে বাদশা মাতুব্বরের সঙ্গে বিয়ে হয়ে এই বাড়িতে আসি। এর পর থেকে পুরো জীবন কেটে গেল এই বাড়িতে। তবে বেশ কয়েক বছর ধরে বাড়িটি বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ায় পাশেই টিন দিয়ে ঘর তুলে থাকছি। আমার স্বামী জীবিত থাকা অবস্থায় এই জমি লিজ নিয়েছে। এখন এই বাড়িটির দখল নেওয়ার জন্যই এলাকার কিছু মানুষ ভূতের বাড়ি বলে অপপ্রচার করছে, যাতে করে আমরা ভয়ে এখান থেকে চলে যাই।’
স্থানীয় ওমর হাসান বলেন, ‘কালের বিবর্তনে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে আমাদের গ্রামের ঐতিহ্যবাহী বাড়িটি। তাই এটি সংরক্ষণের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাই।’
মাদারীপুরের উন্নয়ন সংস্থা দেশগ্রামের নির্বাহী পরিচালক এ বি এম বজলুর রহমান খান বলেন, ‘স্থানীয় ইতিহাস ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাছে এই বাড়িটি সংরক্ষণের দাবি জানাই। যাতে করে আমাদের পুরোনো ঐতিহ্য নতুনরা জানতে পারেন, দেখতে পারেন।’
মাদারীপুরের লোকসংস্কৃতি ও ইতিহাস গবেষক সুবল বিশ্বাস বলেন, ‘ধারণা করা হয়, বাড়িটি প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো। বর্তমানে বাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। সরকারিভাবে বাড়িটি রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি হয়ে পড়েছে। এই বাড়িটি যদি এখনই সংস্কার করে রক্ষার জন্য এগিয়ে না আসা হয়, তাহলে এটি একসময় ধ্বংস হয়ে যাবে। আমাদের ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য এই মূল্যবান বাড়িটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত করে রক্ষা করার দাবি জানাই।’
মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াদিয়া শাবাব বলেন, ‘সরেজমিন এই বাড়িটির মূল্য অনুযায়ী জেলা প্রশাসক ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে এটি সংরক্ষণের কথা জানানো হবে। খোঁজখবর নিয়ে এই পুরোনো বাড়িটি ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’