হোম > সারা দেশ > কুষ্টিয়া

হোম ডেলিভারিতে পৌঁছাচ্ছে মাদক, সীমান্তজুড়ে সক্রিয় সিন্ডিকেট

দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি 

কুষ্টিয়া সীমান্ত এলাকা থেকে বিজিবির হাতে বিভিন্ন সময়ে উদ্ধার হওয়া মাদকদ্রব্য ধ্বংস করা হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

ভারত সীমান্তবর্তী কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে মাদক প্রবেশের পাশাপাশি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয়দের ভাষ্য, এখন আর মাদকসেবীদের নির্দিষ্ট স্থানে যেতে হয় না; একটি ফোন করলেই চাহিদা অনুযায়ী মাদক পৌঁছে যাচ্ছে ‘হোম ডেলিভারি’ পদ্ধতিতে।

পুলিশের একটি গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, এই অবৈধ কারবারের সঙ্গে অসাধু কিছু ব্যক্তি জড়িত। তাঁদের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্য, নামধারী সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগানো ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার সত্যতা মিলেছে।

বিজিবি ও পুলিশের গোয়েন্দা সূত্র জানায়, চিলমারী ইউনিয়নের বাংলাবাজার সীমান্ত এবং উদয়নগর বিওপি-সংলগ্ন পদ্মা নদীর তীব্র ভাঙনে সীমান্তের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে সীমান্তের একটি অংশ ভারতের অভ্যন্তরে চলে যাওয়ায় কয়েকটি এলাকায় দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর টহল কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে উদয়নগর সীমান্তকে মাদক পাচারের অন্যতম রুট হিসেবে ব্যবহার করছে চোরাকারবারিরা।

এ ছাড়া আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের ধর্মদহ ও পশ্চিম ধর্মদহ, প্রাগপুর ইউনিয়নের জামালপুর ও বিলগাতুয়া, রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের চল্লিশপাড়া, ভাগযোতসহ পদ্মা নদীর বিভিন্ন নৌপথ ব্যবহার করেও দেশে মাদক প্রবেশ করছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, দৌলতপুরে প্রতি মাসে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার মাদকের লেনদেন হয়ে থাকে।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বর্তমানে মাদক কারবারিদের প্রধান লক্ষ্য ১৭ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ ও যুবকেরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাদক কারবারির দাবি, ইয়াবা, ট্যাপেন্টাডল ও বিভিন্ন নেশাজাতীয় ট্যাবলেটের চাহিদা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি। আকারে ছোট হওয়ায় এসব মাদক সহজে বহন করা যায় এবং প্রশাসনের নজর এড়াতে সরাসরি বেচাকেনার পরিবর্তে ফোনের মাধ্যমে ‘হোম ডেলিভারি’ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে।

বিজিবির দাবি, ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ৫৫ পয়সায় সংগ্রহ করা এসব নেশাজাতীয় ট্যাবলেট দেশে এনে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করা হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্ত এলাকায় বহিরাগত মোটরসাইকেল আরোহী ও অপরিচিত মানুষের আনাগোনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে বিকেল ও সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে সীমান্ত এলাকায় তরুণদের মাদকসেবনের প্রবণতা বাড়ে, যা স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তা উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।

সীমান্তে বিজিবি ও পুলিশের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকলেও মাদকের প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। কুষ্টিয়া ৪৭ বিজিবি ব্যাটালিয়নের তথ্যমতে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৯ জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযানে প্রায় ১৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা মূল্যের মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে।

উদ্ধারকৃত মাদকের মধ্যে রয়েছে ২ হাজার ২৭৯ বোতল বিদেশি মদ, ৯ লিটার দেশি মদ, ৩ হাজার ২৯৫ বোতল ফেনসিডিল, ১৬১ দশমিক ৩৭৫ কেজি গাঁজা, ২৫ হাজার ৭২টি ইয়াবা, ২ দশমিক ৩৮৫ কেজি হেরোইন, ১২ বোতল এলএসডি, ১ কেজি আফিম, ২৫০ গ্রাম কোকেন, ১ লাখ ১৬ হাজার ৩৬৮টি ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট, ১ লাখ ৬ হাজার ১৭৯টি সিলডেনাফিল ট্যাবলেট, ৪৬ হাজার ৫০৩টি ডেক্সামেথাসন ট্যাবলেট এবং ৫১ হাজার ৭৮০টি সাইপ্রোহেপ্টাডিন ট্যাবলেট।

অন্যদিকে, দৌলতপুর থানা-পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে ১০৬টি মাদক মামলা দায়ের হয়েছে এবং ৭৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদকের সহজলভ্যতার কারণে চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধের প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিকে ১৯ জুলাই আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের গড়ুরা এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া ৪০০ বোতল ফেনসিডিল আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে তেকালা পুলিশ ক্যাম্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিদর্শক (এসআই) ফিরোজ হোসেনের বিরুদ্ধে। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

মাদকের এই অবাধ বিস্তারে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা চরম উদ্বিগ্ন। প্রাগপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফুজ্জামান মুকুল বলেন, ‘আগের তুলনায় মাদকের বিস্তার বেড়েছে। এখন প্রকাশ্যেই কেনাবেচা হচ্ছে, যার সবচেয়ে বড় শিকার তরুণ সমাজ।’

দৌলতপুর সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মহিউল ইসলাম বলেন, ‘মাদকের সঙ্গে কারা জড়িত, তা অনেকেই জানেন। এখন প্রয়োজন কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা।’

দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল হাসান তুহিন বলেন, ‘মাদকাসক্তরা আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। পাশাপাশি তারা শারীরিক ও মানসিক জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, যা সমাজের জন্য বড় হুমকি।’

এদিকে মাদক প্রতিরোধে একক বাহিনীর চেয়ে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দিচ্ছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদুর রহমান স্বীকার করেন যে মাদকের বিস্তার বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘এটি রোধে সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’

​ভেড়ামারা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘সীমান্ত এলাকা হওয়ায় এখানে মাদকের বিস্তার তুলনামূলক বেশি। দ্রুত আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

​কুষ্টিয়া ৪৭ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি বলেন, ‘সীমান্তে মাদক প্রতিরোধে বিজিবি টহল ও জনবল বৃদ্ধি করেছে। প্রতিনিয়ত মাদক উদ্ধার হচ্ছে। তবে দেশের অভ্যন্তরে থাকা মাদক উদ্ধারে পুলিশের সহযোগিতা প্রয়োজন। যৌথ অভিযানের মাধ্যমেই মাদকের বিস্তার কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।’

গতকাল বৃহস্পতিবার বিজিবি, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের যৌথ অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে চারজন মাদকসেবী ও বিক্রেতাকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই দিনে পুলিশের পৃথক অভিযানে ৫৫টি ইয়াবাসহ এক মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সচেতন নাগরিক ও অভিভাবকদের মতে, শুধু খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করে মাদকের বিস্তার রোধ সম্ভব নয়। হোম ডেলিভারিসহ নতুন নতুন কৌশলে পরিচালিত এই অবৈধ কারবারের নেপথ্যে থাকা মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনতে বিজিবি, পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত ও ধারাবাহিক অভিযান জরুরি।

দুই শতকের নীলকুঠি: নির্যাতনের স্মৃতি পেরিয়ে আজ জনসেবার ঠিকানা

কুষ্টিয়ায় রাইস মিলের দূষণে অতিষ্ঠ জনজীবন, পরিদর্শনে তদন্ত কমিটি

ইবির সেই পুকুর থেকে এবার মুমূর্ষু অবস্থায় শিক্ষার্থী উদ্ধার

দলবল নিয়ে নতুন ইউএনওকে সংবর্ধনা দিলেন জামায়াত এমপি, এলাকায় বিতর্ক

কুষ্টিয়ায় এনসিপির পূর্বনির্ধারিত ‘জুলাই পদযাত্রা’ স্থগিত

এক দেহে দুই প্রাণ: দারিদ্র্যের দেয়ালে থমকে দুই শিশুর নতুন জীবনের স্বপ্ন

কুষ্টিয়ায় টিটিইর বিরুদ্ধে বাবা-ছেলেকে ছুরিকাঘাতের মামলা, ট্রেন অবরোধে পৃথক মামলা

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপ-উপাচার্য ড. এমতাজ, কোষাধ্যক্ষ ড. ইদ্রিস

চা বিক্রেতাকে হত্যা করে আত্মগোপন, শ্বশুরবাড়ি থেকে প্রধান আসামি গ্রেপ্তার

মহিষ বিক্রি নিয়ে কথা–কাটাকাটি, ছেলের টর্চের আঘাতে প্রাণ গেল বাবার