কিশোরগঞ্জ শহর থেকে মোটরসাইকেলে মিঠামইনের মহিষাকান্দি গ্রামের দূরত্ব মেরেকেটে দুই ঘণ্টার। সেই পথটুকু পার হতে কোনো কষ্টই হয়নি মাদ্রাসাশিক্ষক মনির হোসেনের (৩৫)। পেছনে বসা স্ত্রী মুন্নি আক্তার (৩০) আর আট বছরের একমাত্র সন্তান মুহাম্মদ আয়ান। সবার মনেই তখন ঈদের আনন্দ। মোবাইল ফোনে মনির হোসেন মাকে বলে রেখেছিলেন, ‘মা, বাড়ি এসে কাল সকালেই মিঠামইনের হাট থেকে কোরবানির গরু কিনব।’
মনির হোসেন তাঁর কথা রেখেছিলেন। দুই ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে বাড়ির একদম কাছাকাছি চলেও এসেছিলেন। কিন্তু এক ঘাতক পিকআপ ভ্যান তাঁদের সেই স্বপ্নকে আর ১০টি মিনিট সময় দিল না। বাড়ির দোরগোড়ায় এসে চিরতরে থমকে গেল একটি পরিবারের গল্প।
গতকাল সোমবার (২৫ মে) সন্ধ্যায় ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অলওয়েদার সড়কের ভাতশালা সেতুর কাছে চালবোঝাই একটি পিকআপ ভ্যানের সঙ্গে মোরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে মুহূর্তেই তছনছ হয়ে যায় মনিরের সাজানো সংসার। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় তিনজন।
নিহত মনিরের ছোট ভাই আশরাফুল ইসলাম ইমন বলেন, দুপুরে যে মানুষটি হাসিমুখে বাসা থেকে বেরিয়েছিল, সন্ধ্যায় তাঁর নিথর দেহ ফিরবে—কেউ তা কল্পনাও করতে পারেনি। এই দুর্ঘটনা শুধু তিনটি প্রাণই নেয়নি, শেষ করে দিয়েছে একটি পরিবারের সব আশা। এক নিমিষেই শেষ হয়ে গেল একটি সুন্দর সংসার।
নিহত মনির হোসেন করিমগঞ্জ নোয়াবাদ এলাকার সাইটুটা দাখিল মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক ছিলেন। পাশাপাশি জেলা শহরে একটি কোচিং সেন্টার চালাতেন। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় মনির ছিলেন পরিবারের সবচেয়ে বড় ভরসা। স্ত্রী মুন্নি ছিলেন সংসারের প্রাণ আর ছোট আয়ান ছিল সবার চোখের মণি।
মনিরের মামাতো ভাই পল্লব হাসান বলেন, ‘কিশোরগঞ্জ থেকে এতটা পথ পাড়ি দিয়ে এসে মাত্র ১০ মিনিটের দূরত্বের কাছে হেরে গেল তিনটি তাজা প্রাণ। মা-বাবার সঙ্গে আর ঈদ করা হলো না ওর।’
যে বাড়িতে কোরবানির ঈদকে ঘিরে কোলাহল থাকার কথা ছিল, সেখানে এখন শুধুই নিস্তব্ধতা আর আহাজারি। ঈদের আনন্দের বদলে শুধুই লাশের সারি। ধানের ব্যবসায়ী বাবা সাফাজ উদ্দিন ব্যাপারী আর মা আনোয়ারা বেগম একটু পরপর চেতন হারাচ্ছেন। তিনটি কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে স্বজনদের কান্না যেন থামছেই না।
আজ মঙ্গলবার (২৬ মে) মহিষারকান্দি মাদ্রাসামাঠে মনির হোসেন, তাঁর স্ত্রী ও সন্তানের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে হাজারো মানুষের সমাগম ঘটে। চোখের জল আর পরম ভালোবাসায় প্রিয় শিক্ষক ও তাঁর পরিবারকে শেষ বিদায় জানায় এলাকাবাসী ও শিক্ষার্থীরা।