হোম > সারা দেশ > ঢাকা

রাজধানীতে যান চলাচল: ক্যামেরার আতঙ্কে সড়কে শৃঙ্খলা

রাসেল মাহমুদ, ঢাকা

ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর সড়কপথের সবচেয়ে ব্যস্ত মোড়গুলোর একটি কারওয়ান বাজার। গত ২৪ মে বেলা ১টার দিকে দেখা গেল মোড়ের প্রতিটি প্রান্তেই শত শত যানবাহন। এ প্রতিবেদক ফার্মগেট থেকে বাংলামোটর অভিমুখী সড়ক থেকে দেখলেন, ট্রাফিক সিগন্যালে লালবাতি জ্বলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নির্ধারিত দাগের আগেই থেমে গেল সামনের গাড়িগুলো। একটি প্রাইভেট কারের সামনের চাকা সিগন্যালের দাগের একটু বাইরে চলে গিয়েছিল। সেটিও কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পিছিয়ে নেন গাড়ির চালক।

ঢাকার রাজপথে এই অভূতপূর্ব দৃশ্যের পেছনের নায়ক এআই ক্যামেরা। শত শত গাড়ির ভিড়ে ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে গুটিকয়েক ট্রাফিক পুলিশের সীমাবদ্ধতা থাকলেও যান্ত্রিক চোখের দৃষ্টি এড়ায় না কিছুই। এআই ক্যামেরায় ধরা পড়ছে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ঘটনা। সে অনুযায়ী দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আর এতেই সতর্ক হয়ে ‘পথে আসতে’ বাধ্য হচ্ছেন চালকেরা।

সেদিন দুপুরে বাংলামোটর মোড়ের সিগন্যালে শশব্যস্ত হয়ে গাড়ি পিছিয়ে নেওয়া চালক আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে কথা হয় একটু পরে। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সিগন্যাল পড়ার সঙ্গে সঙ্গে থেমেছি। কিন্তু গতি একটু বেশি থাকায় সাদা দাগের একটু সামনে চলে গিয়েছিলাম। তাই আবার পেছনে চলে আসি। কারণ কখন আবার মামলা দিয়ে দেয়! আগে ট্রাফিক পুলিশ এগিয়ে এলে নানা অজুহাত দিয়ে পার পাওয়া যেত। কিন্তু এখন ক্যামেরার চোখকে ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ নাই।’

আনোয়ার হোসেনের মতো বহু চালকই এখন জেব্রা ক্রসিং বা বাস স্টপের লাইন অতিক্রম করছেন না। কারণ নির্ধারিত সাদা দাগ অতিক্রম করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা হতে পারে। বহু বছর ধরে ঢাকায় ট্রাফিক বাতি বন্ধ ছিল। যান নিয়ন্ত্রণের কাজ চলে আসছে হাতের ইশারায়। সম্প্রতি কিছু স্থানে ট্রাফিক বাতি স্থাপন করা হয়েছে। আর মোড়ে ট্রাফিক পুলিশ হাতের ইশারা করলেও বরাবরই সামনের কিছু গাড়ি না থেমে ফাঁকফোকর দিয়ে মোড় পার হয়ে যেত। কেউবা ‘স্টপ’ চিহ্ন পেরিয়ে অনেকটা সামনে গিয়ে দাঁড়াত।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স-এআই) পরিচালিত ক্যামেরা ব্যবহার করে সেই ছবিটা বদলে দিচ্ছে রাজধানীর ট্রাফিক পুলিশ কর্তৃপক্ষ। ট্রাফিক আইন না মানলেই চিহ্নিত করে প্রমাণসহ দেওয়া হচ্ছে মামলা। নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে আইন ভঙ্গকারীর কাছে দ্রুত চলে যাচ্ছে খুদে বার্তা। ফলে ট্রাফিক পুলিশকে আর যানবাহনের পেছনে ছুটতে হচ্ছে না। গত ২৯ এপ্রিল রাজধানীতে এই এআইভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।

২৪ মে রাজধানীর কয়েকটি ব্যস্ত সড়ক ঘুরে দেখা যায়, আগের মতো মোড়ের মুখে গাড়ির জটলা নেই। অধিকাংশ মোড়ে সাজার ভয়ে নির্ধারিত দাগের মধ্যেই থামছে যানবাহনগুলো। সাম্প্রতিককালে বসানো ট্রাফিক সিগন্যালগুলোও সচল রয়েছে।

বেলা ২টায় শাহবাগে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের মোড়ে ট্রাফিক সিগন্যালে লালবাতি জ্বলার সঙ্গে সঙ্গে দাগের সামনে থেমে যায় সব যানবাহন। এ সময় এ প্রতিবেদকের প্রশ্নের জবাবে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক ওমর ফারুক বলেন, ‘দাগ পার হলেই ২ হাজার টাকার মামলা খাব। তাহলে সারা দিনের কামাই শেষ। আগে সার্জেন্টের হাতে-পায়ে ধরেও ছাড়া পাওয়া যেত। এখন নাকি ক্যামেরা দিয়ে ভিডিও দেখে মামলা হয়। তাই দুই মিনিট দেরি হলেও মামলার ঝামেলায় পড়তে চাই না।’

পিকআপচালক রাশেদুল বললেন, ‘এখন সিগন্যাল পড়ার আগেই দাঁড়ায়া যাই। চলতি গাড়ি হলে সিগন্যাল পড়তেছে দেখেও পার হয়ে যাওয়া যায়। তবে ফুটেজ দেখে পুলিশ পরে মামলা দিলে কিছু করার থাকবে না।’

গাড়িচালকদের পাশাপাশি আতঙ্কে রয়েছেন রাইড শেয়ারসহ সব বাইকচালকেরাও। কয়েকজন রাইড শেয়ার বাইকচালকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাড়ার কারণে অনেক যাত্রী দ্রুত চলার জন্য তাগিদ দেন। সে ক্ষেত্রে আগে কোনো সিগন্যালে লালবাতি জ্বললে বা পুলিশ হাত ইশারায় থামতে বললেও ফাঁকফোকর দিয়ে চলে যেতেন তাঁরা। কিন্তু এখন যাত্রীরা সিগন্যালে না থামার জন্য পীড়াপীড়ি করলেও তাঁরা মানেন না। মামলার বিষয়টি সারাক্ষণ মাথায় রাখতে হয়।

ইয়াসিন শেখ নামের একজন রাইড শেয়ার বাইকচালক বলেন, ‘সাধারণত মানুষ দ্রুত যাওয়ার জন্যই বাইকে ওঠে। সিগন্যালগুলোতে বাতি জ্বললে বহুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কিন্তু দাগ পার হই না, যদি মামলা দিয়ে দেয়!’

এআই ক্যামেরার মাধ্যমে করা মামলার তথ্য অভিযুক্তরা ফোনের মেসেজে পেয়ে যান। ১৬ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন উপপরিচালক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘বিআরটিএর মেসেজ আসলেই এখন ভয় লাগে।’

১৭ মে মোবাইল ফোনে মেসেজ পান মোটরসাইকেলচালক হেদায়েত উল্লাহ। বাংলামোটরে ট্রাফিক সিগন্যাল পড়ার পর নিয়ম মেনে থেমে যান তিনি। কিন্তু মোটরসাইকেলের সামনের চাকা ট্রাফিকের দাগ পেরিয়ে যাওয়ায় আড়াই হাজার টাকা অর্থদণ্ডের মামলা হয় তাঁর বিরুদ্ধে।

রাজপথে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের বেশ কয়েকজন সদস্য বলেন, এআই ক্যামেরা অধিকাংশ চালককে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে। বেশির ভাগ গাড়ি নির্ধারিত লাইনে দাঁড়াচ্ছে। এখনো কিছু কিছু যানবাহনের চালক ট্রাফিক নিয়ম জানেন না। তাই মোড় পার হয়ে চলে যান। তবে আর কিছুদিনের মধ্যেই পুরোপুরি নিয়ম মেনে চলবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

ডিএমপি জানায়, শুরুতে ঢাকার উত্তরা, বিমানবন্দর সড়ক, মহাখালী, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, শাহবাগ মোড়, হাইকোর্ট ক্রসিং, সচিবালয় সিগন্যাল, কদমফুল ফোয়ারা, মৎস্য ভবন, কাকরাইল মসজিদ ক্রসিং, গুলশান-১ ও ২ নম্বর মোড়, মিরপুর রোডসহ গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে ১০৫টি এআই ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এতে এসব এলাকার যান চলাচলের চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে।

ডিএমপির তথ্যমতে, ১ থেকে ২৩ মে পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে ট্রাফিক আইন অমান্য করায় প্রায় ২ হাজার মামলা হয়েছে। এসব মামলায় জরিমানা করা হয়েছে প্রায় ২৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া বর্তমানে ৮-১০ হাজার ভিডিও ফুটেজ যাচাই করছে ডিএমপির ট্রাফিক টেকনিক্যাল ইউনিট (টিটিইউ)।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘এআই প্রযুক্তিতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক সাড়া মিলছে। তাই শিগগিরই ১০৫টি ক্যামেরা থেকে বাড়িয়ে ৫০০টি ক্যামেরা বসানো হবে।’

অবৈধ অটোরিকশার সমস্যা

রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে এখনো নিবন্ধনহীন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের নিয়ন্ত্রণহীন চলাচল দেখা গেছে। প্রায় প্রতিটি সিগন্যালেই ট্রাফিক আইন অমান্য করতে দেখা গেছে এসব যানকে। এআই ক্যামেরার মাধ্যমে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থায় কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরলেও অননুমোদিত রিকশাগুলো সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, নিবন্ধনহীন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণের জন্য উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে ভিআইপি এলাকায় এসব যানবাহন চলাচল বন্ধ করা হবে।

অস্পষ্ট নম্বরপ্লেটের বিষয়ে

যানবাহনের অস্পষ্ট নম্বরপ্লেটের ব্যাপারেও পুলিশ শিগগিরই অভিযান চালাবে বলে জানান অতিরিক্ত কমিশনার আনিছুর রহমান। দেখা গেছে, রাজধানীর সড়কের অনেক যানবাহনের নম্বরপ্লেট অস্পষ্ট বা ইচ্ছা করে ঢেকে রাখা। এমনকি কিছু যানের আদৌ নম্বরপ্লেট নেই। এগুলো এআই দিয়ে চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে না। ২২ মে রাজধানীর রায়েরবাগে দেখা যায় এক তরুণ মোটরসাইকেলচালক তাঁর নম্বরপ্লেট সমান করে অর্ধেক ঢেকে রেখেছেন। জিজ্ঞেস করলে তিনি স্বীকার করেন, পুলিশ যাতে হুটহাট মামলা দিতে না পারে, তার জন্যই নম্বর ঢেকে দিয়েছেন।

যাঁরা নতুন গাড়ি কিনছেন, তাঁদের নম্বরপ্লেট পেতেও কয়েক মাস সময় লেগে যাচ্ছে। গাড়ির নম্বরের জন্য আবেদন করা এসব ব্যক্তি কাগজ পেলেও নম্বরপ্লেট না পাওয়ায় ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করলেও তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা সম্ভব হচ্ছে না।

এআই প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা ডিএমপির সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট শারমীন আফরোজ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘নম্বরপ্লেট না থাকা, অস্পষ্ট নম্বরপ্লেটের যানবাহনগুলো এআই দিয়ে চিহ্নিত করে মামলা দিতে না পারলেও আমরা ডিএমপির সাইবার ইউনিটের সহযোগিতা নিয়ে তাদের চিহ্নিত করে মামলা দিতে কাজ করছি। আর কোনো যানবাহনের চালক যদি সবকিছু ঠিক থাকার পরও মামলা হয়েছে বলে প্রমাণ দিতে পারেন, তাঁদের মামলা খারিজ হয়ে যায়।’

মিরপুরে খালি বাসা থেকে যুগ্ম সচিবের মায়ের পোকা ধরা মরদেহ উদ্ধার

শিশুর প্রতি সহিংসতা: মামলার গতি কমে উচ্চ আদালতে

শ্রদ্ধা নিবেদনের পর শিল্পী কামরুদ্দীন আবসারকে দাফন

রিকশা ও অটোরিকশা বন্ধ নয়, লাইসেন্সের আওতায় আনা হবে: ডিএসসিসি প্রশাসক

এআই ছবি দিয়ে উত্তরার মেট্রোরেল নিয়ে অপপ্রচার চালানো হয়েছে: ডিএনসিসি প্রশাসক

৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ২ নেতাকে অব্যাহতি

মোহাম্মদপুরে বাসার ফটকে ছিনতাইয়ের শিকার দুই নারী, ভিডিও ভাইরাল

নারায়ণগঞ্জে আজমেরী ওসমানের অনুসারীদের মিছিলে এনসিপির ধাওয়া

সুপ্রিম কোর্টের একটি ভবন থেকে কর্মচারীর লাশ উদ্ধার

রাজধানীর বংশালে গোডাউনে আগুন, দগ্ধ ৩