আংটির ভেতর দিয়ে অনায়াসে প্রবেশ করানো যেত আস্ত একটা শাড়ি; কিংবা পুরো শাড়িখানাই রাখা যেত একটা দেশলাইয়ের বাক্সে। আমাদের গর্বের মসলিন নিয়ে এমন কিংবদন্তির শেষ নেই। কিন্তু এখন সম্ভবত আর সেগুলোকে কিংবদন্তি বলতে পারবেন না, অন্তত বেঙ্গল শিল্পালয়ে গতকাল শুরু হওয়া প্রদর্শনী দেখার পর থেকে তো নয়-ই। প্রদর্শনীতে প্রবেশ করলেই মন ভরে যাবে জামদানি কিংবা আশির দশকের টাঙ্গাইল শাড়ির সূক্ষ্ম কারুকাজ দেখে। হয়তো চমকে উঠবেন আংটির ভেতর ঢুকে যাওয়া এ সময় বোনা মসলিন শাড়ি অবলোকন করে!
ইতিহাস বলে, এই ভূখণ্ড ছিল ‘পৃথিবীর তাঁতঘর’। সমগ্র বিশ্বের বস্ত্র চাহিদার গুরুত্বপূর্ণ অংশের জোগান দিতেন বাংলার তাঁতিরা। শুধু তা-ই নয়, বুননের উৎকর্ষ এবং নকশার নিরিখে বাংলাদেশের তাঁতিরা অপূর্ব নান্দনিক বোধ এবং অসাধারণ শিল্পগুণের পরিচয় দিয়েছেন। এর ধারাবাহিকতা এখনো কিছু মাত্রায় বিদ্যমান।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড ও বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প’ শিরোনামের এই প্রদর্শনীর প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলো, বাংলাদেশের তাঁতশিল্পের সোনালি অতীতকে দর্শকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণ, সাহিত্যিক সূত্র, চিত্রকলা, আলোকচিত্র ইত্যাদি বিভিন্ন আর্কাইভাল উপাদানের নির্বাচিত অংশ এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে; যা হাজার বছরের তাঁতশিল্পের ইতিহাস এবং ঐতিহ্য সম্পর্কে দর্শকদের জানতে ও বুঝতে সাহায্য করবে বলে আশা করা যায়। তবে এই প্রদর্শনীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে তাঁতশিল্পে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণ, প্রযুক্তি ও কৃৎকৌশল হাজির করা হয়েছে; যেগুলো নিয়ে নাগরিক পরিসরে আগ্রহ থাকলেও চাক্ষুষ করার সুযোগ সহসা মেলে না।
যাঁরা ফুটি কার্পাসের গল্প শুনেছেন কিন্তু দেখেননি, তাঁদের জন্য সেই ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। আছে ফুটি কার্পাস থেকে তৈরি সুতা ও কাপড় দেখার সুযোগ। এ প্রদর্শনীতেই সম্ভবত প্রথমবারের মতো উপস্থাপন করা হয়েছে টাঙ্গাইলের প্রখ্যাত তাঁতি মনমোহন বসাক তথা ভাষা বসাককে। এখানে তাঁর তৈরি করা ডিজাইন খাতার ছবি প্রদর্শন করা হচ্ছে।
শুধু তা-ই নয়, প্রদর্শনীর এক অংশে রাখা হয়েছে গারো তথা মান্দি, মণিপুরী ও চাকমা সম্প্রদায়ের পোশাকের নমুনা। আছে জামদানি তাঁত, বেনারসি তাঁত ও পৃথিবীর আদিতম তাঁতগুলোর অন্যতম কোমর তাঁত। উপস্থাপন করা হয়েছে সুতা কাটার চরকা এবং সুতা গোটানোর নাটাই। এগুলো সবই দেখা যাবে—লাইভ।
এই প্রদর্শনীর একদিকে কাচের বাক্সে রাখা হয়েছে কোন রং কোন উপকরণে তৈরি হয়, তার নমুনা। পাশেই আছে একটি ইনস্টলেশন। তাতে পাতার আকারে ঝোলানো রয়েছে প্রাকৃতিক রঙে রঞ্জিত কাপড়। এই অংশের পরেই আছে রেশমের জগৎ। এখানে দেয়ালে ঝোলানো আছে চন্দরকী। তাতে আছে রেশম গুটি। সেই গুটি থেকে তৈরি হয় রেশম সুতা। রেশম বা সিল্ক সুতা তৈরির পুরো প্রক্রিয়ার একটা ধারণা পাওয়া যাবে এই অংশে। তারপর আছে গামছার রঙিন ভুবন।
‘বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প’ নামের এই প্রদর্শনী দেখে বোঝা যায়, এটি হাজার বছরের বাংলাদেশের তাঁতশিল্পের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে জাতীয় নীতিনির্ধারক, সমকালীন ভোক্তাসহ বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের যোগসূত্র তৈরির প্রয়াস।
এটি শুধু প্রদর্শনীই নয়, সঙ্গে চলছে মেলা। বেঙ্গল শিল্পালয়ের লেভেল ৪-এ বসেছে এই মেলা। সেখান থেকে জামদানি, টাঙ্গাইল শাড়িসহ অন্যান্য বস্ত্র কেনার ব্যবস্থা আছে। ১৬ মার্চ পর্যন্ত এই প্রদর্শনী ও মেলা চলবে প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা।
এই প্রদর্শনীর কিউরেটর হিসেবে আছেন শিল্পী ও গবেষক শাওন আকন্দ। কথা হলো তাঁর সঙ্গে। জানালেন, বাংলাদেশ ভূখণ্ডের তাঁতশিল্পের ঐতিহ্য অনেক প্রাচীন—এই তথ্য আমরা সাধারণভাবে জানি। কিন্তু ঢাকা শহরের মানুষদের তা চাক্ষুষ করার উপায় নেই। ‘বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প’ নামের এই প্রদর্শনী সেই সুযোগ করে দিয়েছে। শাওন আকন্দ আরও জানালেন, দেশের শিল্পগুলোর কথা আরও মানুষের সামনে নিয়ে আসতে কিংবা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠার জন্য ধারাবাহিকভাবে এমন প্রদর্শনীর আয়োজন জরুরি।