রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বছিলার গরুর হাটের ইজারা নিয়ে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলালের সঙ্গে বিরোধ ছিল নিহত শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটনের। তবে এই ঝামেলা জলদি মিটমাট হয়ে যাবে বলে জানিয়েছিলেন টিটন। আজ বুধবার (২৯ এপ্রিল) বেলা ২টার দিকে নিউমার্কেট থানার সামনে সাংবাদিকদের এসব কথা জানান নিহত টিটনের বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন।
রিপন বলেন, ‘জামিন পাওয়ার পর টিটন দুবার যশোরে গিয়েছে। এর মধ্যে একবার ঈদের সময় আমার সঙ্গে দেখা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন আগে পিচ্চি হেলালের সঙ্গে বছিলার গরুর হাট নিয়ে বিরোধের কথা সামান্য বলেছিল। তাদের সঙ্গে ঝামেলা চলতেছে; পরে বলতেছে, না বড় ভাই, ঠিক হয়ে যাবেনে, অসুবিধা নাই, দোয়া কইরেন, এটুকুই।’
ইমনের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ইমনের সঙ্গে কোনো বিরোধ ছিল না। এমনিতে ছোটখাটো ঘটনা ভাইবোনের মধ্যে থাকতেই পারে। এটা কিলিং পর্যায়ের কোনো বিরোধ, তা আমি মনে করি না। কারণ, ইমন আমার মায়েরও যত্ন করত। আমার দৃষ্টিতে সে (ইমন) ভালো ছেলে।’
রিপন আরও বলেন, ‘পুলিশকে সব জানানো হয়েছে, আমি চাচ্ছি ন্যায়বিচার হোক। সবার কাছে অনুরোধ, যেন ন্যায়বিচার পাই আমরা।’
সাঈদ আক্তার রিপন বলেন, ‘আমি হাসপাতালে গিয়ে আমার ভাইয়ের মরদেহটা নেব। তারপর যশোরে যেতে হবে, সেখানে দাফন করতে হবে।’
টিটনের বড় ভাই এর আগে আজ সকাল সাড়ে ১০টায় ডিএমপির নিউমার্কেট থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করে নিউমার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আইয়ুব বলেন, টিটন হত্যার ঘটনায় তাঁর বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় ৮-৯ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার রাত পৌনে ৮টার দিকে রাজধানীর নিউমার্কেটের পশ্চিম পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসের সামনে বটতলায় টিটনকে গুলি চালিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ২০০১ সালে সরকার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় টিটনের নাম ছিল।
৫১ বছর বয়সী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের স্ত্রীর বড় ভাই। পুলিশ বলছে, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যকার অন্তর্কোন্দলে টিটনকে হত্যা করা হতে পারে। তাই এই হত্যাকাণ্ডে ইমনসহ সন্দেহভাজন ও সন্দেহজনক সবকিছু সামনে রেখে তদন্ত করছে তারা।
গতকাল রাতে পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম জানান, হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। আশপাশ এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এর আগে রাত সোয়া ১০টার দিকে ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে টিটনের পরিচয় নিশ্চিত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তাঁর বাবার নাম কে এম ফকরুদ্দিন ও মায়ের নাম আকলিমা বেগম। তাঁর বর্তমান ঠিকানা হাজারীবাগ থানার জিগাতলার সুলতানগঞ্জ এলাকায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে রাজধানীর নিউমার্কেট বটতলা শহীদ শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসের সামনের সড়কে এলোপাতাড়ি গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা। একটি মোটরসাইকেলে করে দুই ব্যক্তি এসে টিটনকে লক্ষ্য করে কয়েকটি গুলি ছোড়ে। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে টিটন রাস্তায় পড়ে যান। এ সময় আশপাশের লোকজন দুর্বৃত্তদের ধাওয়া দিলে আতঙ্ক ছড়াতে ফাঁকা গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, দুর্বৃত্তদের দুজনই ক্যাপ ও মাস্ক পরিহিত ছিল। পরে রাস্তায় পড়ে থাকা ওই ব্যক্তিকে দ্রুত উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
এর আগে গত বছর ১০ নভেম্বর বেলা পৌনে ১১টায় পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের সামনে প্রকাশ্যে গুলি করে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ তারিক সাঈফ মামুনকে হত্যা করা হয়। পুলিশের তদন্তে এই হত্যায় নাঈম আহমেদ টিটনের ভগ্নিপতি শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন জড়িত থাকার তথ্য উঠে আসে।
২০০৪ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। তিনি ২০১৪ সালে বাবর এলাহী হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে তিনি জামিনে কারাগার থেকে মুক্তি পান। তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ১২ আগস্ট কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান। তিনি জামিনে থাকলেও আদালতে হাজিরা না দিয়ে পলাতক ছিলেন।