রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে প্রসব-পরবর্তী ওয়ার্ডের ছয় নবজাতকের মৃত্যুর সঠিক কারণ চার দিন পরও অজানা। তদন্ত কমিটির সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বিশুদ্ধ বাতাস চলাচলের সুবিধাহীন কক্ষটিতে অক্সিজেনস্বল্পতায় এই ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। সেখানে স্প্লিট এসি রয়েছে, যা ইমারত নির্মাণ বিধিমালার লঙ্ঘন। সন্তানহারা পরিবারগুলোর কান্না থামছে না।
ঈদের আগের দিন গত ২৭ মে (বুধবার) প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার মধ্যে ওই ওয়ার্ডের ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও দায়িত্বহীনতাকে দায়ী করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। এ ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষ হয়েছে। কমিটির সূত্র বলেছে, প্রতিবেদন দিতে আরও দু-তিন দিন লাগবে।
এ ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছে হাসপাতালটির মালিকানায় থাকা আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন।
এদিকে মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে গতকাল রোববার বিকেলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে মোট ৩ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন।
বিভিন্ন সূত্র জানায়, মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার প্রসব-পরবর্তী ওয়ার্ডে গত মঙ্গলবার রাতে ১১ জন প্রসূতি ও তাঁদের নবজাতক ছিল। এর মধ্যে ছয়টি নবজাতকের বয়স ছিল এক থেকে তিন দিন। অন্য পাঁচটি শিশু আগে থেকেই এনআইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পরিবারগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাতে কয়েকজন মা শিশুদের ঠান্ডা লাগার কথা জানিয়ে ওই কক্ষের শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) বন্ধ করতে বলেন। এ কারণে কিছুক্ষণ বন্ধ রাখার পর আবার এসি চালু করা হয়। এরপর ওয়ার্ডে একরকম গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ভোরের দিকে একে একে ছয়টি শিশুর শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক অস্থিরতা ও বমির উপসর্গ দেখা দেয়। তাদের এনআইসিইউতে নেওয়া হয়। পরে সকাল ৯টার মধ্যে ওই ছয় নবজাতকেরই মৃত্যু হয়।
আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ডা. নাহিদ ইয়াসমিন সাংবাদিকদের বলেন, ভোরের দিকে শিশুদের শ্বাসকষ্ট শুরু হলে তাদের এনআইসিইউতে নেওয়া হয়। এরপর বুধবার সকাল ৬টার আগে একজনের এবং ৬টা থেকে ৯টার মধ্যে বাকি পাঁচ নবজাতকের মৃত্যু হয়।
শোকাহত পরিবারগুলোর অভিযোগ, এটি কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়; কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বহীনতার কারণে তাদের সন্তানদের মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ঘটনার পর থেকে একাধিকবার সাংবাদিকদের বলেছেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কারণে ছয়টি প্রাণ ঝরে গেছে। এ ঘটনা তদন্তে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটি ৩ জুন চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেবে। এ ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এসি থেকে ওয়ার্ডটিতে কোনো বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়েছিল কি না, এমন আলোচনা উঠলে তদন্তে যুক্ত করা হয় প্রকৌশলী ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞকে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্র বলছে, তাঁদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে জাতীয় ইমারত নির্মাণ বিধিমালা (বিএনবিসি) লঙ্ঘন করে স্প্লিট এসি ব্যবহার করা হয়েছে। পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ড, আইসিইউ বা অন্যান্য ‘ক্লিন স্পেসে’ এ ধরনের এসি ব্যবহারের অনুমোদন নেই। এমন পরিস্থিতিতে এসির রেফ্রিজারেন্ট গ্যাস লিক হলে তা দ্রুত শনাক্ত করা বা রোগীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কক্ষে প্রয়োজনীয় ‘ফ্রেশ এয়ার’ বা বাইরের বিশুদ্ধ বাতাস চলাচলের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। বিএনবিসি অনুযায়ী, রোগী ও নবজাতকদের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ বিশুদ্ধ বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সেখানে স্প্লিট এসি ব্যবহার করায় কক্ষের ভেতরে ক্ষতিকর গ্যাস বা দূষিত বায়ু জমে থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়। পরিদর্শক দলের দাবি, হাসপাতালের এক এসি মেরামতকারী তাঁদের জানিয়েছেন, ওই এসিতে রেফ্রিজারেন্ট গ্যাস লিকেজের ঘটনা ঘটেছিল।
কারিগরি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী হাসমতুজ্জামান জানান, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী হাসপাতালের ক্লিন স্পেসের জন্য কোনো স্প্লিট, ভিআরএফ বা উইন্ডো টাইপ এসি ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কারণ, এসব এসির গ্যাস লিকেজ হলে ভেতরে থাকা অসুস্থ রোগীরা প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে বের হতে পারবে না এবং মুহূর্তেই আক্রান্ত হবে।
আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক নাহিদ ইয়াসমিন ছয় নবজাতকের মৃত্যুর দিনই এ ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনা আর কোথাও না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনস্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ও পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. আবু জামিল ফয়সাল আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘এই ছয় মৃত্যুর সম্পূর্ণ দায় কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। এই হাসপাতাল ভবনটি অনেক পুরোনো এবং এখানে স্পষ্ট ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়েছে। অস্ত্রোপচার-পরবর্তী ওয়ার্ডের এসির ছিদ্র থেকে নির্গত গ্যাস বা এসি বন্ধের পর বিকল্প বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় অক্সিজেনের স্বল্পতায় নবজাতকদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।
ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় ২৭ মে এক শিশুর বাবা হাবিবুর রহমান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে আসামি করে রমনা থানায় মামলা করেন। রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশিক ইকবাল বলেন, মামলার এজাহারে কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়নি। গতকাল পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। আদ্-দ্বীন হাসপাতাল অলাভজনক দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন’-এর মালিকানাধীন। এই ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান শেখ মহিউদ্দিন। তিনি আকিজ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম শেখ আকিজ উদ্দিনের বড় ছেলে। শেখ মহিউদ্দিনের ভাই শেখ বশিরউদ্দীন বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত গত শনিবার আদ্-দ্বীন হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে বলেন, হাসপাতালের ওপরের একটি তলায় বৈদ্যুতিক ওভেনের মাধ্যমে পরিচালিত একটি রুটির কারখানা পাওয়া গেছে। তবে সেখানে কোনো ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার পাওয়া যায়নি। কারখানা থেকে এমন কোনো গ্যাস বা রাসায়নিক উপাদান সৃষ্টি হয়েছিল কি না, যা নবজাতকদের সহ্যক্ষমতার বাইরে, সেটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাজার হাজার শিক্ষার্থী, রোগী ও স্বজনদের উপস্থিতি থাকে। এমন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে রুটির কারখানা থাকা উচিত নয়। এটি তদারকির ঘাটতিরই প্রমাণ। তিনি বলেন, হাসপাতালের একটি অংশে দীর্ঘদিন ধরে পানি জমে থাকার বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। রুটির কারখানা কিংবা জমে থাকা পানি থেকে কোনো ক্ষতিকর গ্যাস বা পদার্থ সৃষ্টি হয়ে শিশুদের মৃত্যুর কারণ হয়েছে কি না, তা-ও অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
ছয় শিশুর জন্ম পাঁচটি পরিবারে খুশির বন্যা বইয়ে দিয়েছিল। কিন্তু এক থেকে তিন দিন না পেরোতেই গভীর শোক আচ্ছন্ন করে তুলেছে পরিবারগুলোকে। অস্ত্রোপচারের ধকল কাটার আগেই মায়েরা শুনলেন নাড়িছেঁড়া ধনের মৃত্যুর খবর। তাঁরা বুধবার সন্তান হারানোর শোকে হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডের সামনে নিথর বসে ছিলেন। তাঁদের একজন মুন্সিগঞ্জের মীম ছিলেন প্রায় অচেতন। তাঁর পাশেই তিন দিন বয়সী নাতনিকে কোলে নিয়ে নির্বাক বসে ছিলেন তাঁর শাশুড়ি মাসুকা বেগম।
মাসুকা বেগম বলেন, ‘এত বড় হাসপাতাল, ভরসা করেই আইছিলাম, টাকার চিন্তা করি নাই। কিন্তু আমাদের কি সর্বনাশ করে দিল।’ তিনি জানান, হঠাৎ ওয়ার্ডে থাকা সব নবজাতক একসঙ্গে কান্না শুরু করে। কিছুক্ষণ পরই তাঁর নাতনি মারা যায়। ওই সময় শিশুটির শরীর লালচে হয়ে গিয়েছিল।
নাজমা বেগম হারিয়েছেন যমজ দুই নবজাতক। ফারিহা, জান্নাত ও ফাহিমার কোলও শূন্য হয়েছে।
সন্তানহারা এক প্রসূতির স্বজন শারমিন আক্তার বলেন, তাঁর ভাইয়ের ছেলে মঙ্গলবারও সুস্থ ছিল। পরে হঠাৎ বমি শুরু করে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই মারা যায়। মৃত আরেক শিশুর স্বজন আবু বক্কর বলেন, রাত থেকে কাউকে কক্ষের ভেতরে যেতে দেওয়া হয়নি। সকালে দেখেন একের পর এক শিশুকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তাঁদের কিছু জানানো হয়নি। এই মৃত্যুর পেছনে হাসপাতালের দায় রয়েছে।
আদ্-দ্বীন হাসপাতালে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে শনিবার হামলার শিকার হন গণমাধ্যমকর্মীরা। হাসপাতাল চত্বরে দাঁড়িয়ে কাজ করা নিয়ে বাগ্বিতণ্ডায় নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের একটি দল সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালান। এর পর থেকে গণমাধ্যমকর্মীদের ওই হাসপাতালে ঢুকতে বাধা দেওয়া হচ্ছে।
অবশ্য পরে হাসপাতালের মহাপরিচালক নাহিদ ইয়াসমিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দিয়ে হামলার ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
ডিএসসিসির ভ্রাম্যমাণ আদালত গতকাল বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে অভিযান চালান। অভিযানে বিভিন্ন অনিয়ম ও অসংগতি পাওয়ার পর নিরাপদ খাদ্য আইনের আওতায় ২ লাখ টাকা এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের আওতায় ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
অভিযানে নেতৃত্ব দেন ডিএসসিসির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম। অভিযানে ডিএসসিসির সহকারী পরিচালক, আঞ্চলিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক এবং পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে হাসপাতালটির নবজাতক ওয়ার্ডে ছয় নবজাতকের মৃত্যু ও অসুস্থতার ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠনের দাবিতে গতকাল লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও ন্যাশনাল লইয়ার্স কাউন্সিলের চেয়ারম্যান এস এম জুলফিকার আলী জুনু। একই সঙ্গে দেশের সব বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের জরুরি চিকিৎসাসেবার মান যাচাই এবং অনিয়ম প্রতিরোধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনারও আবেদন জানানো হয়েছে।