হোম > সারা দেশ > ঢাকা

শহীদ জিয়া শিশুপার্ক: স্বপ্নপুরীতে দুঃস্বপ্নের দৈত্য

সাখাওয়াত ফাহাদ, ঢাকা 

শহীদ জিয়া শিশুপার্কের সংস্কারকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল এক বছরে। কিন্তু তা শেষ হয়নি সাত বছরেও। রাজধানীর শাহবাগে পার্কটির বর্তমান চিত্র এখনো এ রকম। গতকাল তোলা। ছবি: মেহেদী হাসান

১৯৮০ সালের তুমুল জনপ্রিয় শিশুতোষ বাংলা ছায়াছবি ‘ছুটির ঘণ্টা’র জনপ্রিয় একটি গান ‘আমাদের দেশটা স্বপ্নপুরী’। একদল শিশু আর বিখ্যাত জাদুশিল্পী জুয়েল আইচকে নিয়ে এই গানের দৃশ্যটির শুটিং হয়েছিল তখনকার ঝকঝকে নতুন এই পার্কে। তখনো অনাবশ্যক আড়ম্বরের মুখ না দেখা সাদাকালো যুগের বাংলাদেশে শাহবাগের ছিমছাম শিশুপার্কটি ছিল সত্যিই শিশুদের স্বপ্নপুরী।

সারা দেশের শিশুদের স্বপ্নের এই পার্কের কপালে একসময় শুরু হয় দুঃস্বপ্নের প্রহর। বছরের পর বছর কাটলেও তা শেষ হচ্ছে না। রূপকথার গল্পে শিশুদের বাগানে ঢুকতে বাধা দিয়েছিল হিংসুক দৈত্য। আর বাস্তবে অদক্ষতা, দুর্নীতি, অবহেলার অশুভ দানো মিলে আটকে রেখেছে শহীদ জিয়া শিশুপার্কের সংস্কারকাজ। এক বছরের কাজ শেষ হয়নি সাত বছরেও।

শুরু থেকে এ পর্যন্ত

প্রেসিডেন্ট জিয়ার শাসনামলে ১৯৭৯ সালে পর্যটন করপোরেশনের অধীনে ১৫ একর জমির ওপর স্থাপিত হয়েছিল শিশুপার্কটি। ১৯৮৩ সালে তৎকালীন ঢাকা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয় এটি। তখন এর পরিচয় ‘ঢাকা শিশুপার্ক’ নামে। বেশ পরে, ২০০২ সালে বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকা তখনকার ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র হয়ে পার্কের নামকরণ করেন ‘শহীদ জিয়া শিশুপার্ক’। এরপর আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে শেখ ফজলে নূর তাপস ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র হওয়ার পর ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে এর নাম বদল করে রাখা হয় ‘হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী শিশুপার্ক’। চব্বিশের অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ডিএসসিসি ‘শহীদ জিয়া শিশুপার্ক’ নামটি পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত নেয়। ইতিমধ্যে নানা কারণে এককালের ঝকঝকে তকতকে পার্কটি তার জৌলুশ অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছিল। তারপরও রাজধানীতে উন্মুক্ত স্থান ও পারিবারিক বিনোদনের জায়গার গুরুতর অভাবের মধ্যে পার্কটি ছিল মধ্যবিত্তের পছন্দের জায়গা। এর আসল দুর্গতি শুরু হয় ২০১৯ সালে।

সেই যে বন্ধ হলো...

আধুনিকায়নের জন্য ২০১৯ সালের শুরুতে এক বছরের কথা বলে বন্ধ করা হয়েছিল পার্কটি। কিন্তু সাত-আট বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। ৭৮ কোটি টাকার প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০৪ কোটি টাকায়। কিন্তু নতুন রাইড কেনার টেন্ডার প্রক্রিয়াই এখনো শেষ হয়নি। সব প্রক্রিয়া শেষ করে পার্ক চালু হতে আরও অন্তত দুই বছর লাগতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত বুধবার পার্কে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে আছে নির্মাণসামগ্রী। কোথাও কাজ চলছে, আবার কোনো অংশের কাজ শেষ হয়েছে বেশ আগে। পার্কের অধিকাংশ স্থানে জন্মেছে বড় বড় আগাছা। ভূগর্ভস্থ পার্কিংয়ের নির্মাণ শেষ হলেও সংস্কারকাজ পুরো শেষ হয়নি।

পার্কের নিরাপত্তাকর্মী, কর্মরত শ্রমিক ও সংস্কারকাজের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিভিন্ন সময়ে নানা কারণে দীর্ঘ সময় কাজ বন্ধ ছিল। তবে কয়েক মাস ধরে আবার কাজ চলছে।

ব্যয় বেড়েছে ৭ গুণের বেশি

শিশুপার্ক আধুনিকায়নের কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে। প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এ কাজের জন্য ১ জানুয়ারি ২০১৯ থেকে পার্কটি সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের স্বাধীনতাস্তম্ভ নির্মাণ-তৃতীয় পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত প্রকল্পটি তখন ছিল ৭৮ কোটি টাকার। কিন্তু নানা জটিলতায় কাজ তেমন এগোয়নি। পরে ২০২৩ সালের অক্টোবরে শেখ ফজলে নূর তাপস মেয়র থাকার সময় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নিজস্ব উদ্যোগ হিসেবে ৬০৩ কোটি ৮১ লাখ টাকার নতুন প্রকল্প অনুমোদন করিয়ে নেন। প্রকল্পের বেশির ভাগ ব্যয়ই ধরা হয় নুতন রাইড কেনা ও স্থাপনে। এসব রাইডের জন্য ধরা দাম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। চব্বিশের পটপরিবর্তনের পর মিডিয়ায় প্রচারিত খবরে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের আশীর্বাদপুষ্ট মেয়র তাপসের সময় রাইডগুলোর দাম যৌক্তিক মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দেখানো হয়েছিল।

প্রকল্প পরিচালক বদলি

শিশুপার্ক প্রকল্পের পরিচালক আনিছুর রহমানের বিরুদ্ধে একপর্যায়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ডিএসসিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ইতিমধ্যে তাঁকে বদলি করা হয়েছে। অভিযোগ তদন্তের বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে এখনো নতুন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়নি বলে কাজ আরও বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম সম্প্রতি আজকের পত্রিকাকে বলেন, শিগগির পরিচালক নিয়োগের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এখানে কাজ দেখাশোনা, হিসাবের ব্যাপার আছে।

নতুন রাইড এখনো টেন্ডার পর্যায়ে

ডিএসসিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পার্কের ভৌত নির্মাণকাজ শেষ হলে রাইড বসানোর কাজ শুরু হবে। ইতিমধ্যে রাইড কেনার দরপত্র প্রক্রিয়া চলছে। প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, ১৫টি নতুন রাইড কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। এর তারিখ আবারও বাড়ানো হয়েছে। রাইডগুলো বিদেশ থেকে আনতে হবে। এলসি, আমদানি, স্থাপনসহ পুরো প্রক্রিয়ায় সময় লাগবে।

আগে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পার্ক চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে পরে তা পরিবর্তন করে ২০২৭ সালের শুরুর কথা জানায় ডিএসসিসি। তবে এই তারিখও পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। পার্ক কবে নাগাদ দর্শনার্থীদের জন্য খোলা হবে জানতে চাওয়া হলে প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, এটি নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। সময় লাগবে।

পার্ক কবে খুলে দেওয়া হতে পারে এমন প্রশ্নে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ধারণা, পার্কটি পুরোপুরি চালু হতে আগামী বছরের মে পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।’

সার্বিকভাবে কর্মকর্তাদের কথায় ধারণা পাওয়া যায়, রাইডগুলো বিদেশে তৈরি হয়ে দেশে এসে পৌঁছতে প্রায় এক বছর সময় লাগতে পারে। এরপর স্থাপন ও পরীক্ষামূলক পরিচালনার কাজ করা হবে।

প্রকল্পের কাজের সঙ্গে যুক্ত অন্যতম প্রতিষ্ঠান স্বাধীন কনস্ট্রাকশনের সাইট ম্যানেজার হাসিবুর রহমান বলেন, বর্তমানে পুরোদমেই কাজ চলছে। তবে এভাবে কাজ চললেও ন্যূনতম আরও এক বছর সময় লাগবে শেষ হতে।

দীর্ঘসূত্রতার পেছনে অদক্ষতা ও দুর্নীতি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুসহ নাগরিকদের কল্যাণের বিষয়ে অবহেলার মানসিকতা, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং দুর্নীতির কারণে প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে আছে। জনপ্রিয় বিনোদনকেন্দ্রটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার ফলে রাজধানীর শিশুরা তুলনামূলকভাবে সুলভে বিনোদনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এটি তাদের মানসিক বিকাশ এবং নগরজীবনের মানের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ঢাকায় উন্মুক্ত খেলার মাঠ ও সরকারি বিনোদনকেন্দ্র কমে যাওয়ায় পরিবারগুলোকে ব্যয়বহুল বেসরকারি বিনোদনকেন্দ্রের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

নগর-পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, চালু থাকা শহীদ জিয়া শিশুপার্কটি সীমিত সংস্কার ও আধুনিকায়নের মাধ্যমেই উন্নত করা যেত। কিন্তু অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিশাল বাজেটের প্রকল্প, ভূগর্ভস্থ পার্কিং, বড় বড় রাইড এবং অতিরিক্ত কংক্রিটনির্ভর অবকাঠামো যুক্ত করে পার্কটির মূল অবকাঠামোই বদলে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রকল্পটির শুরুতেই উদ্দেশ্য অসৎ ছিল। এর পরিকল্পনা, ব্যয় বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য অনিয়মের বিষয়গুলো তদন্ত করে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা প্রয়োজন।

সরকারের আন্তরিকতা থাকলে এক বছরের মধ্যেই পার্কটি চালু করা যেতে পারে বলে মনে করেন আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেন, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যত দ্রুত সম্ভব পার্কটিকে আবার ব্যবহার উপযোগী করে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা। তবে এটি যেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো ব্যয়বহুল বাণিজ্যিক বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।

বাঁচানো যায়নি রাস্তা থেকে উদ্ধার অনাথ শিশু মাহিকেও

মওদূদীর তফসির গ্রন্থ পোড়ানোর ঘটনায় গ্রেপ্তার যুবক কারাগারে

মিরপুর ১০ মেট্রো স্টেশনে উচ্ছেদ অভিযান

ধামরাইয়ে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে ছুরিকাঘাত, ১৪ দিন পর আহতের মৃত্যু

মধ্যরাতে বাবা-মায়ের কাছ থেকে হারিয়ে যায় শিশু, সকালে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে যুবককে গণপিটুনি

রাজধানীর পোস্তগোলা ব্রিজে ট্রাকের ধাক্কায় মোটরসাইকেলচালক নিহত

রাজধানীর বংশালে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে যুবক নিহত, দগ্ধ ১

সায়েদাবাদে থাকবে সিটি টার্মিনাল, আন্তজেলা বাস যাবে কাঁচপুরে: ডিএসসিসি প্রশাসক

ঘুষ নিয়ে হাতেনাতে আটক বেবিচক পরিদর্শকের পাঁচ বছর কারাদণ্ড

চার মেট্রো স্টেশন এলাকায় অভিযান, উচ্ছেদ করা হলো অবৈধ দোকানপাট