বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সৌরির লাশ উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার তাঁর ‘বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই’ আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ অনেক কিছু জানেন এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তিনি জড়িত থাকতে পারেন বলে ধারণা করেছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কিন্তু তিনি জিজ্ঞাসাবাদে একেক সময় একেক কথা বলছেন। এই অবস্থায় দৃশ্যপটে এসেছেন জেরিকা তাসনিম দিশা নামের এক তরুণী। বলা হচ্ছে, তিনি তাহসিফের বান্ধবী। গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদে তাঁর ও দীপের বক্তব্যের মিল-অমিলগুলো ধরার চেষ্টায় আছেন তদন্তকারীরা।
দীপের ডাকে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরার বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন তাহসিফ। পরদিন বিকেলে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় অজ্ঞাত- পরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে গত শুক্রবার রাতে উত্তরখান থানায় হত্যা মামলা করেন তাঁর বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। এরপর দীপকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, দীপের বক্তব্যে বারবার গরমিল পাওয়ায় তাঁর ওপর সন্দেহ বেড়েছে। দীপের প্রথম ভাষ্য ছিল, টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় পুলিশের ধাওয়া খেয়ে তাহসিফ নদে ঝাঁপ দেন। কিন্তু ওই রাতে সেখানে দায়িত্ব পালন করা পুলিশ সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং দীপের অবস্থান-সংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে তাঁর বক্তব্যের মিল পাচ্ছেন না তদন্তকারীরা; বরং ঘটনার দিন পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়ার বিষয়টি দীপ গোপন করেছিলেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘দীপ অনেক কথা বলছেন। সেগুলো যাচাই-বাছাই চলছে। তদন্তের এই পর্যায়ে এখনই সবকিছু না বলা ভালো।’
তবে জিজ্ঞাসাবাদে জেরিকা তাসনিম দিশা নামের এক তরুণীর বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন দীপ। বলা হচ্ছে, তিনি তাহসিফের বান্ধবী। ঘটনার দিন তাহসিফের সঙ্গে উত্তরার একটি বারে ঢুকতে ও বের হতে দেখা গেছে ওই তরুণীকে। এই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেছে। এসব জানার পর গত শনিবার রাতে ঢাকার কাফরুল এলাকা থেকে দিশাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গতকাল রোববার তাঁকে ঢাকার মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট রিপন হোসেনের আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ফিরোজ উদ্দিন। শুনানি শেষে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন বলে জানান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার এবং উত্তরার বিভিন্ন এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, ২৭ অক্টোবর রাতে ঘটনার আগে দিশাকে নিয়ে উত্তরার নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলেন তাহসিফ। ওই সন্ধ্যায় তাঁরা সিপি ফাইভ স্টার স্ন্যাকসেও খাবার খান। সিসিটিভি ফুটেজে তাহসিফের সঙ্গে একটি মোটরসাইকেলের গ্যারেজেও দিশাকে দেখা গেছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, তাহসিফের মোবাইল ফোনের কল লিস্ট পর্যালোচনা করে দিশার সঙ্গে একাধিকবার কথা বলার তথ্য পাওয়া গেছে। এখন হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন, অন্য অজ্ঞাতনামা আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, হত্যার স্থান নির্ধারণ, আলামত উদ্ধার এবং দীপের বক্তব্যের সঙ্গে দিশার বক্তব্য মিলিয়ে দেখতে তাঁকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার দিন মাদক বিক্রি ও সেবনের স্থান হিসেবে পরিচিত টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় মধ্যরাতে তাহসিফের সঙ্গে গিয়েছিলেন দীপ। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বলেছিলেন, সেদিন রাতে মাজার বস্তি এলাকায় একদল পুলিশ ধাওয়া করলে তিনি তুরাগ নদের তীরে একটি পিলারের আড়ালে লুকিয়ে পড়েন। আর তাহসিফ নদে ঝাঁপ দেন।
তাহসিফ হত্যা মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে ওই রাতে টহলে থাকা টঙ্গী পশ্চিম থানা-পুলিশের দলটিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে তদন্ত সংস্থা। টহল দলের সদস্যরা জানান, দীপের শরীরে নোংরা-আবর্জনা লেগে ছিল। তাঁকে দেখে সন্দেহ হওয়ায় টহল পুলিশের এক সদস্য থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এ সময় দীপ নিজেকে সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন পরিচয় দেন।
টহল দলের এক সদস্যের ভাষ্য অনুযায়ী, দীপের প্যান্টের নিচের অংশ ও জুতায় কাদা ও ময়লা পানি লেগে ছিল। তবে নিজেকে ক্যাপ্টেন পরিচয় দেওয়ায় টহল দলের সদস্যরা কথা না বাড়িয়ে তাঁকে চলে যেতে বলেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, একাধিক ব্যক্তি মিলে তুরাগ নদে চুবিয়ে তাহসিফকে হত্যা করে থাকতে পারেন। এতে তাঁর শরীরে আঘাতের চিহ্ন না থাকার বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যেতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে তদন্ত ও ময়নাতদন্তের তথ্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। ঘটনার বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পেতে দীপ ও দিশাকে মুখোমুখি বসিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায় পুলিশ।