২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১ লাখ ২২ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৩৬ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা বেশি, যা প্রায় ২৮ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে। শিক্ষা খাতে রেকর্ডসংখ্যক বরাদ্দ হলেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পিছিয়ে বাংলাদেশ।
আজ বুধবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘কেমন হলো শিক্ষা বাজেট: বাস্তবতা ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য উঠে আসে।
গণসাক্ষরতা অভিযান বাজেটের ওপর এই ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে। গণসাক্ষরতা অভিযান সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরীর স্বাগত বক্তব্যের পর মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন সংগঠনটির উপপরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। এ ছাড়া শিক্ষা খাতে বাজেট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ শাহাদৎ হোসেন, বিআইজিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন ও গণসাক্ষরতা অভিযানের কার্যক্রম ব্যবস্থাপক আব্দুর রউফ।
শিক্ষা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন ক্যাম্পেইন ফর পপুলার এডুকেশন (ক্যাম্পে) প্রকাশিত এক বিশ্লেষণ তুলে ধরে ড. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, দীর্ঘ এক দশকের স্থবিরতার পর শিক্ষা খাতে এই বরাদ্দ বৃদ্ধি ইতিবাচক ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। তবে এটি এখনো শিক্ষাব্যবস্থার গভীর কাঠামোগত সংকট মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ৭৯ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১ দশমিক ৪১ শতাংশ। একই সঙ্গে জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতের অংশ ১০ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৩ দশমিক ৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
খাতভিত্তিক বরাদ্দের মধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য ৪৬ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের জন্য ৫৭ হাজার ৩০১ কোটি টাকা এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের জন্য ১৮ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাজেট বৃদ্ধির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো উন্নয়ন ব্যয়ের ব্যাপক বৃদ্ধি। উন্নয়ন ব্যয় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ২০ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৫২ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে, যা ১৫৩ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি।
প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষার্থীদের কল্যাণ ও ডিজিটাল রূপান্তরের লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিনা মূল্যে স্কুল ইউনিফর্ম, জুতা ও ব্যাগ বিতরণ এবং উপবৃত্তি কর্মসূচির সম্প্রসারণ, মিড-ডে মিল সম্প্রসারণ, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও কাউন্সেলিং সেবা, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়তা, বিনা মূল্যে ওয়াই-ফাই সম্প্রসারণ, মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ, ‘ওয়ান টিচার-ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি এবং শিক্ষকদের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রশিক্ষণ। এ ছাড়া ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সম্প্রসারণ, তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, স্নাতকদের জন্য ইন্টার্নশিপ সহায়তা, ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন, জলবায়ু শিক্ষা এবং সবুজ অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগও রাখা হয়েছে।
ক্যাম্পের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বরাদ্দ বৃদ্ধি সত্ত্বেও শিক্ষা খাতে এখনো জাতীয় শিক্ষা ভিশন, শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষাক্ষেত্রে আঞ্চলিক বৈষম্য, প্রাথমিক সাক্ষরতা ও গণনা দক্ষতা, ডিজিটাল বৈষম্য, প্রতিবন্ধী শিশু, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, গবেষণা এবং শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি। সংগঠনটি আরও উল্লেখ করেছে, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ এখনো ইউনেসকোর সুপারিশ করা জিডিপির ৪-৬ শতাংশ, সরকারি ব্যয়ের ১৫-২০ শতাংশ এবং সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয়ের লক্ষ্য থেকে অনেক নিচে রয়েছে।
সংগঠনটির পক্ষে উদ্বেগ প্রকাশ করে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, এক অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয়ে অতিরিক্ত ৩১ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। পরিকল্পনা, ক্রয়, প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা না বাড়লে বরাদ্দ করা অর্থের একটি বড় অংশ অব্যবহৃত থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে থাকা ও ঝরে পড়া শিশুদের পুনরায় শিক্ষায় ফিরিয়ে আনতে এই বাজেট কতটা কার্যকর হবে, সে প্রশ্নও উত্থাপন করেছে সংগঠনটি।
সংগঠনটি ২০২৭ সালের মধ্যে একটি জাতীয় শিক্ষা ভিশন প্রণয়ন, শিক্ষাসামগ্রী আমদানিতে সব ধরনের কর প্রত্যাহার, শতভাগ উন্নয়ন তহবিল ছাড় নিশ্চিত করা, ফলাফলভিত্তিক অর্থায়ন কাঠামো চালু, শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন কাঠামো প্রণয়ন এবং প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণের সুপারিশ করেছে। মধ্য মেয়াদে ২০৩০ সালের মধ্যে শিক্ষা খাতে জিডিপির কমপক্ষে ৬ শতাংশ ও জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে একটি আইনগত অর্থায়ন রোডম্যাপ নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছে ক্যাম্পে।
ক্যাম্পের মতে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শিক্ষা বাজেট শিক্ষা খাতে অগ্রাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। তবে কেবল বরাদ্দ বৃদ্ধি নয়, বরং সেই অর্থ কীভাবে দক্ষ শিক্ষক, উন্নত শিক্ষার মান, বৈষম্য হ্রাস, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যবহৃত হবে, সেটিই হবে প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।