ঢাকা: মোশাররফ মিয়া (৫০)। বাড়ি ময়মনসিংহ হালুয়াঘাট এলাকা। কাজ করতেন টঙ্গীর একটি গার্মেন্টসে। ২০২০ সালে লকডাউনে তিনি চাকরি হারান। পরে ঢাকাতে রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন। পরিবার নিয়ে থাকেন তেজগাঁও এলাকায়। এ বছর করোনা সংক্রমণ বাড়ায় চলমান লকডাউনে আবার বিপদে পড়েছেন তিনি। সোমবার বাংলামোটর এলাকায় কথা হয় মোশাররফ মিয়ার সঙ্গে। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, 'লকডাউনে ঘরে বসে থাকলে তো খাবার আসে না, রিকশার চাকা ঘুরলেই আমাদের পেট চলে। লকডাউনের প্রথম দুইদিন রিকশা নিয়ে বের হলে পুলিশ রাস্তায় ঝামেলা করছিল, যাত্রীও পাইনি। ওই দুইদিন পরিবার নিয়ে খেয়ে না খেয়ে ছিলাম। এখন পুলিশের ঝামেলা কম, রাস্তায় যাত্রীও বাড়ছে। যা উপার্জন হয় তাতেই দিন চলছে।'
সর্বাত্মক লকডাউনের ষষ্ঠ দিনে অন্য শ্রমজীবী মানুষের মতো ঘর থেকে বেরিয়েছেন মালিবাগ রেল গেইট এলাকার ফল বিক্রেতা বেলাল হোসেন (৫৬)। এক জায়গায় তিনি প্রায় ২০ বছর ধরে ব্যবসা করেন। তিনি বলেন, 'নিরুপায় হয়ে দোকান নিয়ে বসেছি। কিছু বিক্রি হলে দুমুঠো ভাতের জোগাড় হবে।'
মগবাজার এলাকার ভ্রাম্যমাণ ডাব বিক্রেতা মোহাম্মদ সুমন। ভ্যানে ফেরি করে কখনো ডাব, কখনো সবজি বিক্রি করেন। তিনি বলেন, 'লকডাউন তবুও বের হয়েছি। কিছু যদি বিক্রি হয়। কারণ ধার দেনা করে সংসার চলছে। এভাবে আর কতদিন টেকা যায়। '
দশ বছর ধরে কারওয়ান বাজার বাংলাভিশনের সামনের ফুটপাতে মুচির কাজ করেন রাজু রিশি (৪২)। সরকারের কঠোর লকডাউননেও রাস্তায় কেন জানতে চাইলে আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, 'আরাম করে বসে থাকতে তো আমাদেরও ইচ্ছে করে। তারপরও লকডাউনে বাধ্য হয়ে বেরিয়েছি। কারণ কাজ না করলে তো পেট চলে না। সকাল থেকে ১২০ টাকার কাজ হয়েছে। অন্য স্বাভাবিক সময়ে চার-পাঁচশ টাকা ইনকাম হয়। লকডাউনে আয় কম হলেও পেট তো চলছে।'
সমাজ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক বছরের বেশি সময় ধরে করোনা পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। গত বছর দীর্ঘ লকডাউনে অনেকে জীবিকা হারিয়েছেন। যে দারিদ্র্যের হার ২০১৯ সালের শেষের দিকে ২০ শতাংশের মতো ছিল, সেটা বেড়ে এখন ৪০-৪১ শতাংশ হয়ে গেছে। তার মানে, গরীব মানুষের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। নতুন কোনো চাপ নেওয়ার ক্ষমতা এখন নিম্ন আয়ের মানুষের নেই।
এমন পরিস্থিতিতে সরকারের প্রধান ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নেহাল করিম। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, সরকার এখানে খেলছে। করোনা সংক্রমণ বাড়ছে, আগেই লকডাউন দেয়া দরকার ছিল। রাষ্ট্রীয় নানা আয়োজন আর মোদির আগমনের কারণে লকডাউন পেছানো হয়েছিল। এখন সরকারের উচিত হবে, লকডাউনে যে গরীব মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের সহযোগিতা করা। দেশব্যাপী নোঙ্গরখানা খুলে দিয়ে, খেটে খাওয়া মানুষ, যারা দিন আনে দিন খায়, তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা। এমন উদ্যোগ না নিলে সমাজে আরো বৈষম্য বাড়বে, একই সঙ্গে বাড়বে দেশে গরীবের সংখ্যা।