ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে সংসদ নির্বাচন হওয়ায় এবারের বইমেলার তারিখ নির্ধারণ নিয়ে ‘ক্যাঁচাল’ হয়েছে বিস্তর। মেলা আদৌ হয় কি না, তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন অনেকে। তারিখ পেছানোর বিরোধীরা ঐতিহ্য ভঙ্গ হওয়া নিয়ে অনুযোগ করেছিলেন। পিছিয়ে রোজায় চলে গেলে মেলা জমবে না, এমন যুক্তিও ছিল। তবে আগেও কয়েকবার রোজার মধ্যে বইপ্রেমীরা মেলায় এসেছেন প্রাণের টানে। এবারও আসছেন।
বইমেলা যেহেতু সন্ধ্যাতেই জমে, তাই অনেককে ইফতারের পালা সারতে হয় মেলা প্রাঙ্গণে। তার ব্যবস্থাও মন্দ নয়। স্টলগুলোর কর্মীরা নিজেদের ইফতারের আয়োজন করেন প্রতিদিনই। আর দর্শনার্থীদের জন্য আছে খাবারের দোকান। সেখানে ইফতারসামগ্রীর পসরা সাজানো থাকে। সময় হয়ে গেলে কেনাবেচায় সাময়িক বিরতি দিয়ে নিরিবিলিতে চলে রোজাদারদের ইফতারের পালা। কিছুক্ষণের জন্য হলেও মেলাজুড়ে তৈরি হয় অন্য রকম আবহ।
গতকাল সন্ধ্যায় দেখা গেল, কোনো কোনো স্টলের সামনে ত্রিপল বিছিয়ে বসেছেন অনেকে। মেলার জায়গার পাশে স্বাধীনতা স্মৃতিস্তম্ভের লেকের শানবাঁধানো বসার জায়গা এবং তার আশপাশেও ছোট ছোট জটলা। সবার সামনে ইফতারি।
সিজদাহ প্রকাশনীর বিক্রয়কর্মী নাজমুল জারিফ প্রতিদিনই স্টলে ইফতার করেন। তিনি বললেন, ‘রোজার মধ্যে মেলা হওয়ায় স্টলেই ইফতার করি। আমরা নিজেদের প্রয়োজন থেকে একটু বেশি আয়োজন করি। কারণ, কোনো কোনো দিন ক্রেতারাও কেউ কেউ আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যান।’
চাকরিজীবী মো. আহসানুল হক পরিবার নিয়ে মেলার মাঠে ইফতার করছিলেন। তিনি জানালেন, বই দেখতে দেখতে সময় হয়ে যাওয়ায় এখানেই ইফতার করছেন। সাধারণত বাসায় ইফতার করেন। মেলায় ইফতার তাঁর কাছে নতুন এক অভিজ্ঞতা।
নতুন বইয়ের খোঁজে
ভাষা আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোর চিত্র স্থির হয়ে আছে সেই সময়ের কিছু বিরল আলোকচিত্রে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো কলাভবনের সামনে ১৪৪ ধারা ভাঙার প্রস্তুতি, ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে ছাত্রছাত্রীদের প্রতিবাদ, নবাবপুর রোডে ছাত্রীদের শোভাযাত্রা, আমতলায় ছাত্র সমাবেশ—ভাষা আন্দোলনের এমন অনেক ছবি বইপত্রিকার সূত্রে পাঠকের চোখে ভাসে। কিন্তু সেই ঐতিহাসিক ছবিগুলোর পেছনের কারিগর কারা, তা নিয়ে কি কেউ ভাবেন? কেমন পরিস্থিতিতে তোলা হয়েছিল একেকটি ছবি। কোনো কোনোটি তোলা ছিল বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। ভাষা আন্দোলনের সেই সব ছবির পেছনের গল্প তুলে ধরেছেন আলোকচিত্রী সাহাদাত পারভেজ তাঁর ‘ভাষা আন্দোলন—পাঁচ আলোকচিত্রীর চোখে’ বইটিতে। এটি বের করেছে স্বপ্ন ৭১। বইটিতে তখনকার পাঁচ আলোকচিত্রী শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুব, মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ, আমানুল হক, অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ও মীজানুর রহমানের তোলা ছবির ওপর আলোকপাত করা হয়েছে।
১৯৪৭ সাল ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এক বিশাল ঘটনাবহুল। সে বছরই ‘ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’ বিভক্ত হয়ে জন্ম নেয় ভারত ও পাকিস্তান নামের দুই স্বাধীন রাষ্ট্র। পূর্ববঙ্গের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে থাকা সিলেট ভারত, নাকি পাকিস্তানে পড়বে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে? সমাধানে আয়োজিত হয় গণভোট। সেই ভোটে পাকিস্তানের সঙ্গে থাকার পক্ষে রায় আসে। সেই ঐতিহাসিক গণভোটের পটভূমি, সিলেট ভাগ এবং তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিক সেলিম আহমেদ লিখেছেন গবেষণাধর্মী বই ‘১৯৪৭: কাঁটাতারে বিভক্ত সিলেট’। বইটি প্রকাশ করেছে কথক প্রকাশনী।
তথ্যকেন্দ্র বলছে, গতকাল মেলায় নতুন বই জমা পড়েছে ১৬৩টি। এখন পর্যন্ত মোট বই বেরিয়েছে ৯৯৬টি।
অন্যান্য আয়োজন
মূলমঞ্চে ছিল শহীদ বুদ্ধিজীবী কথাসাহিত্যিক শহীদুল্লা কায়সারকে নিয়ে আলোচনা। এতে শিবলী আজাদ বলেন, পূর্ব বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঔপন্যাসিক শহীদুল্লা কায়সার। বামপন্থী রাজনীতি, সাংবাদিকতা ও লেখকবৃত্তি শহীদুল্লা কায়সারের খ্যাতির মূল কারণ হলেও স্বাধীনতার প্রাক্কালে শাহাদাতবরণ তাঁকে দিয়েছে অনন্য এক মর্যাদা। শহীদুল্লা কায়সারের জীবদ্দশায় পূর্ব বাংলায় ঘটেছে ব্যাপক সামাজিক, রাজনৈতিক ও আর্থিক ভাঙচুর; পাশাপাশি ঘটেছে সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর। আর সেসব সামাজিক রূপান্তরের চিহ্ন তাঁর সাহিত্যে উঠে এসেছে।
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজমের সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেন সাহিত্যিক প্রশান্ত মৃধা। ‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে নিজের বই নিয়ে আলোচনা করেন অনুবাদক ফয়েজ আলম এবং জাভেদ হুসেন। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল কবিতা পাঠ, আবৃত্তি, গান। আজ মঙ্গলবার মেলা শুরু হবে বেলা ২টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত।