বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) একাধিক কার্যক্রমে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বিশেষ করে তৃতীয় বিভাগ ক্রিকেট বাছাই লিগ, বিপিএলের টিকিট বিক্রি এবং মুজিব বর্ষ উপলক্ষে গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচিতে ব্যয়ের ক্ষেত্রে অসংগতির অভিযোগে খতিয়ে দেখার সুপারিশ করা হয়েছে।
দুদকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র আজকের পত্রিকাকে জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিসিবির কর্মকাণ্ড নিয়ে ওঠা অভিযোগ খতিয়ে দেখতে গিয়ে বেশ কিছু অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের তথ্য মিলেছে। প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে কয়েকটি অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এর আগে বিসিবির সাবেক পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে ওঠা ২৭টি অভিযোগের বিষয়ে বেশ কিছু নথিপত্র সংগ্রহ করে দুদক। এর মধ্যে রয়েছে পূর্বাচল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম প্রকল্প, বিসিবির অডিট প্রতিবেদন, আইসিসি ও এসিসি থেকে পাওয়া অর্থের বণ্টন, বিপিএল পরিচালনা ব্যয়, লজিস্টিকস খাতের খরচ এবং বিদেশি কোচ নিয়োগসংক্রান্ত তথ্য।
দুদকের অনুসন্ধানে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে তৃতীয় বিভাগ ক্রিকেট বাছাই লিগ নিয়ে। এই লিগ থেকে উত্তীর্ণ ক্লাবগুলোর প্রতিনিধিরা বিসিবির কাউন্সিলর হওয়ার সুযোগ পান। বোর্ডের ভোটের রাজনীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে এসব ক্লাবের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিজেদের অনুকূলে কাউন্সিলর সংখ্যা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী লিগ পরিচালনায় অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে।
বিসিবির সাবেক সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের আমলে ২০১৩-১৪ মৌসুম থেকে তৃতীয় বিভাগ লিগে অংশগ্রহণের শর্ত কঠোর করা হয়। ৫০ হাজার টাকার এন্ট্রি ফি বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করা হয়। পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ কমিটি, গঠনতন্ত্র ও স্থায়ী ঠিকানা বাধ্যতামূলক করা হয়। তবে দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাস্তবে এসব শর্তের অনেকগুলোই মানা হয়নি। গত এক দশকে লিগে অংশ নেওয়া ও উত্তীর্ণ হওয়া অন্তত ১৮টি ক্লাবের কোনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি বা স্থায়ী ঠিকানার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এমনকি কয়েকটি ক্লাবের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদকের পরিচয়ও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
দুদক বলছে, কঠোর শর্ত আরোপের পরও তা উপেক্ষা করে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের পক্ষে ভোটার বাড়ানোর উদ্দেশ্যে তৃতীয় বিভাগ লিগ পরিচালনার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে প্রকাশ্য অনুসন্ধান করা যেতে পারে।
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, কয়েকটি ক্লাব নিজেদের পরিচয় ও কমিটি পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। বিসিবির কাছে নাম পরিবর্তন ও নতুন কমিটি অনুমোদনের আবেদন জমা পড়েছে।
ক্লাবগুলোর ঠিকানা নিয়েও গুরুতর অসংগতি পেয়েছে দুদক। কয়েকটি ক্লাব একই ঠিকানা ব্যবহার করেছে। কোথাও ব্যক্তিগত বাসা, কোথাও আবাসিক ভবন, আবার কোথাও করপোরেট অফিসকে ক্লাবের স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে দেখানো হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানে অন্তত চারটি ক্লাবের সঙ্গে বিসিবির সাবেক পরিচালকদের সম্পৃক্ততার তথ্যও পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বর্তমান পরিচালক ফাহিম সিনহা এবং সাবেক পরিচালক শায়ান এফ রহমানের নাম রয়েছে।
এ ছাড়া বিপিএলের টিকিট বিক্রি এবং মুজিব বর্ষ উপলক্ষে বিসিবির বিভিন্ন কর্মসূচিতে ব্যয়ের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগের প্রাথমিক ভিত্তি পেয়েছে দুদক। এসব বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধানের সুপারিশ করা হয়েছে।
দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বিসিবির প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। প্রকাশ্য অনুসন্ধানের অনুমোদন মিললে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক লেনদেনের বিস্তারিত খতিয়ে দেখা হবে।’