জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের রাজনৈতিক দল গঠনকে বড় ভুল হিসেবে উল্লেখ করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী। তাঁর মতে, কোনো গণ-অভ্যুত্থানের সুফল এক দিনে পাওয়া যায় না। বরং দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক প্রস্তুতি, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়, জনগণের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক এবং জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার মধ্য দিয়ে এর আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত হয়। জুলাইয়ের নেতাদের রাজনৈতিক দল গঠনের আগে আরও সময় নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তোলা প্রয়োজন ছিল বলেও তিনি মনে করেন।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাজধানীর ডেইলি স্টার সেন্টারে ‘সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও চব্বিশের ছাত্র-জনতা আন্দোলনের বীরদের’ সঙ্গে গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন এই সভা আয়োজন করে।
দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘কোনো অভ্যুত্থান এক দিনে সংঘটিত হয় না, একইভাবে এর সুফলও এক দিনে আসে না। একটি অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সমাজের প্রচলিত কাঠামো ভেঙে নতুন করে সমাজ গঠনের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়, তা বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন।’ তিনি বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে বলেই পরদিন থেকে সবকিছু প্রত্যাশামতো পরিবর্তিত হয়ে যাবে—এমনটা আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। বরং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ধরে রেখে দীর্ঘ মেয়াদে কাজ করতে হবে।’ এ ক্ষেত্রে সোভিয়েত ইউনিয়ন, রাশিয়া ও কিউবার মতো দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও দীর্ঘমেয়াদি অভিজ্ঞতার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, বড় ধরনের সামাজিক রূপান্তরের সুফল পেতে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া তরুণদের মধ্যে নেতৃত্ব, রাজনৈতিক অবস্থান এবং দল গঠন নিয়ে বিভক্তির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন দিলারা চৌধুরী। তাঁর মতে, আন্দোলনের সময় যে ঐক্য তৈরি হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়ে ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। নানা কারণে জুলাইয়ের নেতাদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, সবচেয়ে বড় ভুল হয়েছে, জুলাইয়ের লিডার (নেতা) যারা ছিল, তাদের রাজনৈতিক দল গঠন করা। কারণ, রাজনৈতিক দল কখনো এক দিনে করা যায় না। রাজনৈতিক দল করতে হলে সময় লাগে। জনগণের তৃণমূলের পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাতে হয়।’
এ প্রসঙ্গে দিলারা চৌধুরী আরও বলেন, ‘পলিটিক্যাল দল গঠন করাটা...জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃস্থানীয় যাঁরা ছিলেন বা কাছাকাছি ছিলেন, আমি মনে করি তাঁরা...আমি ভুল শব্দটা ব্যবহার করব না...আমার মনে হয়, তাঁদের বুঝতে অসুবিধা হয়েছে।’
এ সময় বাংলাদেশের সংবিধান, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং প্রতিবেশী ভারতের ভূমিকা নিয়ে নিজের উদ্বেগ প্রকাশ করেন দিলারা চৌধুরী। তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসকে কখনো কখনো এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যাতে এ দেশের জনগণের আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের ভূমিকা যথাযথ গুরুত্ব পায় না।
এই রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের সমাজে নানা ধরনের বিভক্তি, ব্যক্তিগত স্বার্থ, রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও আত্মকেন্দ্রিকতা তৈরি হয়েছে। এসব দুর্বলতা দেশের অভ্যন্তরীণ ঐক্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং বাইরের শক্তির প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করেছে।
দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘সাংস্কৃতিক প্রভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা অনেক সময় মানুষ সচেতনভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। কোনো শক্তিশালী গোষ্ঠী বা রাষ্ট্র রাজনৈতিক বয়ানের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বয়ান তৈরি করেও অন্য সমাজের মানুষের চিন্তা ও বিশ্বাসকে প্রভাবিত করতে পারে।’
এ সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যিক অবদান এবং তাঁর ঐতিহাসিক সামাজিক অবস্থান নিয়ে কথা বলেন দিলারা চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান অসামান্য। তাঁর সাহিত্যকর্ম, গল্প, প্রবন্ধ ও কবিতা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক অবদানের পাশাপাশি তাঁর জমিদারি পরিচয় এবং তৎকালীন অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা করা প্রয়োজন।’
শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়েও আলোচনা করেন দিলারা চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘পূর্ব বাংলা ও পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের রাজনৈতিক দাবি তুলে ধরা এবং জনগণকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে শেখ মুজিবুর রহমানের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।’ তবে তাঁর মতে, এসব অবদানের স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তাঁর শাসনামলের বিভিন্ন দিকও সমালোচনামূলকভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
দিলারা চৌধুরী মনে করেন, বাংলাদেশের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য যথেষ্ট সমৃদ্ধ। তাই জাতীয় সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিদেশি প্রভাব নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি নিজেদের লোকজ ঐতিহ্য, সামাজিক মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক সম্পদ বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কামাল আকবরের সভাপতিত্বে গোলটেবিল আলোচনায় আরও উপস্থিত ছিলেন আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার ভূঁইয়া প্রমুখ।