বৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডবে কুমিল্লাজুড়ে বিদ্যুৎব্যবস্থায় ব্যাপক বিপর্যয় নেমে এসেছে। জেলার একাধিক উপজেলায় খুঁটি ভেঙে পড়া, ট্রান্সফরমার বিকল ও তার ছিঁড়ে যাওয়ায় অন্তত ২৭ হাজার গ্রাহক দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন অবস্থায় দুর্ভোগে পড়েছেন।
মঙ্গলবার ভোর থেকে শুরু হওয়া কালবৈশাখীতে কুমিল্লার ১৭টি উপজেলাতেই বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখা গেছে। ঝোড়ো হাওয়ার তীব্রতায় অসংখ্য বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়ে এবং গাছ ভেঙে পড়ে লাইনের ওপর। এতে একদিকে যেমন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, অন্যদিকে মেরামতকাজও ব্যাহত হচ্ছে।
ঝড়ের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা। পরীক্ষা সামনে রেখে অন্ধকারের জন্য বিঘ্ন ঘটছে লেখাপড়ার, এ ছাড়া পরীক্ষা দিতে গিয়ে পড়ছে বিপাকে, বিদ্যুৎ না থাকায় অন্ধকারে মোমবাতি জ্বালিয়ে দিতে হচ্ছে পরীক্ষা। এতে পরীক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিভাবকেরা।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ সূত্রে জানা গেছে, আদর্শ সদর, সদর দক্ষিণ, লালমাই, চৌদ্দগ্রাম, বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়া—এই ছয় উপজেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গত দুই দিনে এসব এলাকায় ৭১টি বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়েছে। প্রায় ১ হাজার ২৫টি স্থানে লাইনের ওপর গাছ পড়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। এ ছাড়া ৭৩৮টি স্থানে তার ছিঁড়ে গেছে এবং প্রায় ৫৫০টি মিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে ৩৫টি ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে যাওয়ায় অন্তত ২৭ হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার দিলীপ চন্দ্র চৌধুরী বলেন, ‘২৬ এপ্রিলের ঝড়ের পর আমরা সংযোগ স্বাভাবিক করেছিলাম। কিন্তু ২৮ এপ্রিলের ঝড়ে আবারও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। আমাদের টিম দিনরাত কাজ করছে, তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।’
এদিকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর আওতাধীন চান্দিনা, দেবিদ্বার, মুরাদনগর ও বরুড়া উপজেলাতেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। ঝড়ের পর এসব এলাকায় টানা প্রায় আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। পরে বিকেল নাগাদ জাতীয় গ্রিডের মূল সংযোগ মেরামত করে আংশিক সরবরাহ চালু করা হয়।
সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী রাশেদুজ্জামান বলেন, ‘ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র এখনো পুরোপুরি নির্ধারণ করা যায়নি। আমাদের কর্মীরা মাঠপর্যায়ে কাজ করছে, দ্রুত সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।’
বরুড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান রনি জানান, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঝড়ে গাছ ভেঙে পড়ায় সড়ক ও বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যাহত হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দ্রুত গাছ অপসারণ ও বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরুদ্ধারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কুমিল্লায় পল্লী বিদ্যুতের চারটি সমিতির আওতায় ক্ষয়ক্ষতির সামগ্রিক হিসাব এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে অন্যান্য অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণেও সময় লাগবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
কুমিল্লা আবহাওয়া অফিস জানায়, ২৮ এপ্রিল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত জেলায় ১০২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়ার এই অস্থিতিশীল অবস্থা আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে বৈশাখী ঝড়ে কুমিল্লার বিদ্যুৎব্যবস্থা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দ্রুত মেরামতকাজ সম্পন্ন না হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।