কুমিল্লার দেবিদ্বারে গৃহবধূ ফরিদা বেগম (৫৫) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গতকাল শনিবার থেকে অভিযান চালিয়ে ভুক্তভোগীর দেহের নানা অংশ উদ্ধার করা হলেও মাথা উদ্ধার করা যাচ্ছিল না। অবশেষে আজ রোববার সিসিটিভি ফুটেজ দেখে একটি ঝোপ থেকে মাথা উদ্ধার করা হয়। তবে হাত-পায়ের অংশ এখনো পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় আটক লাইলী আক্তারের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে চারজনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে।
গতকাল মধ্যরাতে নিহত গৃহবধূর স্বামী মো. মফিজুল ইসলাম ভূঁইয়া (৭২) বাদী হয়ে দেবিদ্বার থানায় মামলা করেন। মামলায় হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে আটক দেবিদ্বার পৌর এলাকার চাপানগর গ্রামের আবুল কালামের স্ত্রী লাইলী আক্তারসহ (৩৫) চারজনকে অভিযুক্ত করা হয়। মামলার অন্য আসামিরা হলেন একই বাড়ির জহিরুল ইসলামের ছেলে মো. আমির হোসেন (২৮), মৃত ফারুক মিয়ার ছেলে মো. সোহেল (৩৫) ও মৃত লিলু মিয়ার ছেলে মো. রবিউল ইসলাম (২৪)। আজ দুপুরে লাইলী আক্তারকে কুমিল্লা কোর্টহাজতে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ জানায়, আটক লাইলী আক্তার লাশ কেটে খণ্ড খণ্ড করে প্যাকেটজাত করার কথা বলেছেন। পুলিশের ভাষ্য, গৃহবধূকে বালিশচাপা দিয়ে হত্যার পর বাথরুমে নিয়ে শরীরের অঙ্গ আলাদা করা হয়। পরে সেগুলো পলিথিনে ভরে বস্তাবন্দী করা হয়।
দেবিদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আসামিরা পলাতক থাকায় হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় ও লাশের অংশবিশেষ গোপন করার তথ্য সংগ্রহে সমস্যা হচ্ছে। আটক লাইলী আক্তারের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করতে কোর্টে পাঠিয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, চেহারা বিকৃত করতে ঘাতকেরা প্রথমে শরীরের চামড়া ছিলে মরদেহ খণ্ড খণ্ড করে ফেলে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে একটি ঝোপ থেকে মাথা উদ্ধার করা হয়েছে। মাথায় চুল ছিল না, চামড়া ছিল না। হাত-পায়ের অংশ উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত আছে।
আজ রোববার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত লাইলী আক্তার ছাড়া আর কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।
গতকাল সন্ধ্যায় ১১টি পলিথিন ব্যাগে মরদেহের খণ্ডিত অংশ উদ্ধারের পর আজ দিনভর অভিযানে নিহত গৃহবধূর বাসার পাশের ময়লার ভাগাড়, ঝোপঝাড় এবং একটি পরিত্যক্ত ঘরের ড্রাম থেকে আরও দুটি ব্যাগভর্তি মাংস ও নিহত গৃহবধূর পরিধেয় কাপড় উদ্ধার করা হয়। পরে ভিডিও ফুটেজ দেখে একটি ঝোপ থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় নিহত গৃহবধূর মাথা উদ্ধার করে পুলিশ। এ পর্যন্ত মোট ১৪টি পলিথিন ব্যাগে খণ্ডিত দেহাংশ উদ্ধার হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিকেলে ঘটনাস্থলে পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ইমাম হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচজন এসআই ও পুলিশের সদস্যরা উদ্ধারকাজ এবং বিভিন্ন স্থাপনায় থাকা সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় কাজ করেন।
গতকাল বিকেলে দেবিদ্বার পৌর এলাকার ছোট আলমপুর মোহনা পূর্বাশা আবাসিক এলাকার দেবিদ্বার দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে মফিজুল ইসলাম ভূঁইয়ার মালিকানাধীন বাসায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটে। নিহত ফরিদা বেগম (৫৫) দেবিদ্বার পৌর এলাকার ফতেহাবাদ ভূঁইয়া বাড়ির বাসিন্দা এবং মফিজুল ইসলাম ভূঁইয়ার স্ত্রী।
মামলার বাদী মো. মফিজুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, ঘটনার সময় তিনি চট্টগ্রামে কর্মস্থলে ছিলেন। গত ২২ জুলাই লাইলী আক্তার তাঁর বাসার একটি কক্ষ ভাড়া নেন। বাসা মেরামত এবং স্ত্রীসহ ওমরাহ হজ পালনের জন্য তিনি স্ত্রীর কাছে সাত লাখ টাকা পাঠিয়েছিলেন। তাঁর দুই মেয়ে ও স্ত্রীর প্রায় ১০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার ছিল, সেগুলো ঘরে নেই। একটি আলমারির চাবিও পাওয়া যাচ্ছে না বলে তিনি অভিযোগ করেন।
নিহত গৃহবধূর প্রতিবেশী আমেনা বেগম বলেন, গত শুক্রবার ফরিদা বেগম গয়না পরে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন। ওই গয়না লুট করতেই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে বলে তাঁর ধারণা।
এদিকে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের ফাঁসির দাবিতে আজ বিকেল সাড়ে ৫টায় কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের দেবিদ্বার নিউমার্কেট এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করেন স্থানীয় এলাকাবাসী।
প্রসঙ্গত, লাইলী আক্তার ২০২১ সালের ৭ নভেম্বরে একটি শিশু হত্যা মামলারও আসামি ছিলেন। ওই মামলায় গ্রেপ্তারের পর প্রায় সাড়ে চার বছর পর সম্প্রতি জামিনে বেরিয়ে আসেন।