• প্রায় ১৫ শ্রমিক তাঁর বাগানে কাজ করছেন
• সারি সারি গাছে ঝুলছে থোকা থোকা আম
• সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আয় হয়েছে প্রায় ৫ লাখ টাকা
আমের মৌসুম শেষ হয়েছে অনেক আগেই। বাজার থেকে হিমসাগর, ল্যাংড়া, ফজলি, আম্রপালি—এক এক করে বিদায় নিয়েছে। অথচ চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর পৌর এলাকার খয়রাবাদে ঢুকলেই মনে হবে, আমের মৌসুম বুঝি এখনো শেষ হয়নি।
সারি সারি গাছের পাতার ফাঁকে ঝুলছে থোকা থোকা আম। কোনো গাছে কাটিমন, কোনো গাছে কল্যাণভোগ। আবার এমন কিছু আম আছে যার জাতের নাম এখনো জানেন না বাগানের মালিক। নভেম্বর মাসেও গাছভরা আম দেখে পথচারীদের অনেকে থমকে দাঁড়ান। বিস্ময়ের সঙ্গে প্রশ্ন ছোঁড়েন, এখনো আছে আম?
এই আমের পেছনে আছেন রবিউল ইসলাম রবি। প্রায় তিন দশক গাছ, চারা, সায়ন ও আমের জাত নিয়ে কাজ করতে করতে তিনি গড়ে তুলেছেন ১২ বিঘার বিশাল আমবাগান। তাঁর বাগানে শুধু প্রচলিত জাত নয়; রয়েছে অসময়ে ফলন দেওয়া, দেশের বাইরে থেকে আনা এবং পরীক্ষামূলকভাবে লাগানো নানা জাত।
কাটিমন, ক্ষীরশাপাতি, গৌড়মতি, ইলামতি, স্যান্ডি, চিয়াইমাই, রেড পালমার, কিং অব চাপাতি, হানিবিউ, বারি-৭, আম্রপালি, বারি-৪, কল্যাণভোগ—এক বাগানে এত জাতের আমের সমাহারই বলে দেয়, রবির কাজ শুধু আম ফলানো নয়; আমের নতুন জাত খোঁজাও তাঁর নেশা।
আর সেই নেশা এখন পরিণত হয়েছে ব্যবসায়িক উদ্যোগে। ২০২৪ সালে কল্যাণভোগের সায়ন বিক্রি করে তাঁর আয় হয়েছিল ৩৪ হাজার ৫০০ টাকা। ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয় প্রায় ২ লাখ টাকা। আর চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্তই আয় হয়েছে প্রায় ৫ লাখ টাকা।
রবিউল ইসলামের স্বপ্ন—শুধু আমের মৌসুমেই নয়, দেশের মানুষ যাতে সারা বছরই কম দামে আম খেতে পারেন। আর সেই লক্ষ্যেই তিনি খুঁজছেন নতুন নতুন জাত।
রবিউল ইসলাম বলেন, ‘১৯৯৭ সালে এসএসসি পাস করার পর ছাত্রজীবন থেকে নার্সারির ব্যবসা শুরু করি। আস্তে আস্তে সঠিক আমের জাত নির্ণয়ের জন্য মাদার গাছ তৈরি করতে থাকি। তখন থেকে বাণিজ্যিক আমের বাগান করার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে থাকি।’ ২০১৮ সালে এসে তিনি সিদ্ধান্ত নেন—শুধু নার্সারি নয়, নিজেই বাণিজ্যিকভাবে আমবাগান করবেন। মাত্র দেড় বিঘা জমি লিজ (ভাড়া) নেন। সেখানে কল্যাণভোগ আমের সায়ন করেন। নিজের হাতে পরিচর্যা করেন গাছগুলো। এরপর একে একে অন্য জাতের সায়নও (যে ভালো জাতের ডালটি রুটস্টকের সঙ্গে জোড়া হয়) গ্রাফটিং করতে থাকেন। সেই ছোট্ট বাগানই একসময় হয়ে ওঠে বড় স্বপ্নের ভিত্তি।
একটি জাতের ফলন ভালো হলে সেটির সংখ্যা বাড়িয়েছেন। নতুন জাতের খবর পেলে সায়ন সংগ্রহ করেছেন। আবার কোনো জাত নিয়ে সন্দেহ থাকলে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি গাছ লাগিয়ে ফলনের অপেক্ষা করেছেন। এভাবেই ধীরে ধীরে বেড়েছে বাগানের আয়তন। আজ সেই বাগান ১২ বিঘার।
রবির বাগানে ঢুকলে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে বৈচিত্র্য। একই ধরনের গাছের সারি নয়; বরং বিভিন্ন জাতের গাছ পাশাপাশি। কোনো জাত দ্রুত ফল দেয়। কোনো জাত দেরিতে। কোনো জাতের আম বাজারে প্রচলিত। আবার কোনো জাত সম্পর্কে স্থানীয় কৃষকেরা খুব কমই জানেন।
রবি দেশ-বিদেশ থেকে বিভিন্ন জাতের সায়ন সংগ্রহ করে সেগুলো পরীক্ষামূলকভাবে নিজের বাগানে লাগাচ্ছেন। তিনি বলেন,
‘দেশ-বিদেশ থেকে নতুন নতুন জাতের সায়ন নিয়ে এসে পরীক্ষামূলকভাবে কাজ করছি। কয়েকটি জাত নিয়ে এখনো কাজ চলছে।’ তাঁর উদ্দেশ্য একটাই—কোন জাত চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাটি ও আবহাওয়ায় ভালো করে, সেটি খুঁজে বের করা।