চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে চরাঞ্চলের মানুষের জরুরি স্বাস্থ্যসেবায় চালু করা নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি এখন অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। একসময় যে অ্যাম্বুলেন্স নদীপথের দুর্গম এলাকার রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দিত, সেটিই খোলা আকাশের নিচে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। তবে, এটি দ্রুত সংস্কার করে চালুর দাবি জানিয়েছে স্থানীয় বাসিন্দারা।
জানা গেছে, ২০২০ সালের ২৫ আগস্ট তৎকালীন সংসদ সদস্য আনুষ্ঠানিকভাবে এই নৌ অ্যাম্বুলেন্সটির উদ্বোধন করেন। উপজেলার উন্নয়ন তহবিল থেকে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ছয় আসনের এই বিশেষায়িত অ্যাম্বুলেন্সটি পাঁকা ও দুর্লভপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসাসেবার কথা বিবেচনা করে চালু করা হয়। এর পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় পাঁকা ইউনিয়ন পরিষদকে।
উদ্বোধনের পর প্রথম দিকে কয়েক মাস নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি চলাচল করলেও ধীরে ধীরে এর কার্যক্রম কমে আসে এবং ২০২২ সালের পর এটি বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে এটি ইউনিয়ন পরিষদের পাশেই খোলা জায়গায় অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অ্যাম্বুলেন্সটির কাঠামো ও যন্ত্রাংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকায় মাদকসেবী ও অসাধু ব্যক্তিরা এর সাইরেন, সিট, নাটবল্টুসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ খুলে নিয়ে গেছে। ফলে এটি এখন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এমনকি শিশুদের খেলাধুলার স্থান হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হচ্ছে, যা এর দুরবস্থারই প্রমাণ বহন করে।
স্থানীয়দের মতে, চরাঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় জরুরি সময়ে রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সে ক্ষেত্রে নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি সচল থাকলে বহু মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হতো। তাই এটি সংস্কার করে পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছে তারা।
পাঁকা ইউনিয়নের বাসিন্দা শহিদুজ্জামান বলেন, ‘অ্যাম্বুলেন্সটি চালুর পর ছয়-সাত মাস ভালোই চলেছিল। কিন্তু হঠাৎ করে এটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আর কখনো পানিতে নামানো হয়নি। প্রায় চার বছর ধরে এটি এভাবেই পড়ে আছে।’
দশরশিয়া গ্রামের পল্লিচিকিৎসক শামীম রেজা অভিযোগ করে বলেন, এটি মূলত রোগীদের ব্যবহারের জন্য চালু করা হলেও বাস্তবে খুব বেশি কাজে লাগানো হয়নি। কিছুদিন ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কাজে ব্যবহারের পর সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। এর পর থেকে এটি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।
পাঁকা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব আব্দুল আহাদ জানান, ‘প্রাথমিকভাবে কিছুদিন নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি চালু ছিল। কিন্তু জ্বালানি খরচ বেশি হওয়া এবং পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় এটি নিয়মিত চালানো সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিন খোলা জায়গায় পড়ে থাকায় এর অবস্থা এখন খুবই খারাপ। মেরামত করতে আনুমানিক দুই-আড়াই লাখ টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
আব্দুল আহাদ আরও বলেন, চুরি হয়ে যাওয়া যন্ত্রাংশের কারণে এটি বর্তমানে সম্পূর্ণ অচল এবং পুনরায় চালুর বিষয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘নৌ অ্যাম্বুলেন্সটির বিষয়টি আমার জানা ছিল না। এখন বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জেলা সিভিল সার্জন এ কে এম শাহাব উদ্দিন বলেন, ‘অ্যাম্বুলেন্সটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য আমার কাছে নেই। তবে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং শিবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে খোঁজ নিতে বলা হয়েছে।’
সিভিল সার্জন আরও বলেন, ভবিষ্যতে চরাঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নৌ অ্যাম্বুলেন্সগুলোর কার্যকারিতা বজায় রাখার বিষয়ে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্যোগ নেওয়া হবে।