চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তবর্তী একটি সড়ক একই দিনে দুবার উদ্বোধনের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল রোববার সকালে সড়কটির নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ও জামায়াত নেতা নুরুল ইসলাম বুলবুল। একই দিন বিকেলে সড়কটি পুনরায় উদ্বোধন করেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা পরিষদের প্রশাসক হারুনুর রশীদ।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই নেতার মধ্যে শুরু হয়েছে পাল্টাপাল্টি সমালোচনা। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জেরেই ঘটেছে উদ্বোধন ও পাল্টা উদ্বোধনের ঘটনা। তবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) জানিয়েছে, সড়কটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন এখনো হয়নি।
সড়কটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের বাখের আলী বিওপি ক্যাম্প থেকে ফরিদপুর বিওপি ক্যাম্প পর্যন্ত বিস্তৃত। ৩ কিলোমিটার ৫৫০ মিটার দীর্ঘ সড়কটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ কোটি ৯৪ লাখ ৪০ হাজার ৫৩১ টাকা। এলজিইডির তত্ত্বাবধানে নির্মিতব্য সড়কটি চালু হলে সীমান্তে বিজিবির টহল ও নজরদারি সহজ হবে। পাশাপাশি পদ্মা নদীতীরবর্তী সীমান্ত এলাকার মানুষের যাতায়াতেও সুবিধা বাড়বে।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে সড়কটির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে গতকাল সকালে নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের এমপি ও ঢাকা দক্ষিণ মহানগর জামায়াতের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল। একই দিন বিকেলে সড়কটি পুনরায় উদ্বোধন করেন সাবেক এমপি, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও জেলা পরিষদের প্রশাসক হারুনুর রশীদ।
দুই নেতা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে একে অপরের সমালোচনা করেন। সকালে নুরুল ইসলাম বুলবুলের অনুষ্ঠানে এলজিইডির নাম-সংবলিত ব্যানার থাকলেও বিকেলে হারুনুর রশীদের অনুষ্ঠানে তা দেখা যায়নি। তিনি ফিতা কেটে সড়কটির উদ্বোধন করেন। তবে দুই অনুষ্ঠানেই এলজিইডির কর্মকর্তা ও ঠিকাদার উপস্থিত ছিলেন।
উদ্বোধন শেষে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এমপি নুরুল ইসলাম বুলবুল জানান, জেলার উন্নয়নে সাবেক এমপি হারুনুর রশীদকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে তাঁর কোনো আপত্তি নেই। তবে সরকারি উন্নয়নকাজে এমপির তদারকির অধিকার রয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে সদর আসনে যেসব উন্নয়নকাজ হবে, সেগুলোর দায়িত্ব তাঁর। জনগণ তাঁকে ৬২ হাজার ৬১৯ ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত করেছেন। তাঁর উদ্যোগে নেওয়া কাজ অন্য কেউ উদ্বোধন করবেন, এমন এখতিয়ার জনগণ কাউকে দেয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
একই সড়ক দুবার উদ্বোধনের বিষয়ে জানতে চাইলে হারুনুর রশীদ মোবাইল ফোনে জানান, সড়কটির বরাদ্দ ও প্রকল্প তিনি নিয়ে এসেছেন। সাবেক এমপি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে তিনি সড়কটি পরিদর্শন কিংবা উদ্বোধন করতেই পারেন। এ বিষয়ে এমপি বুলবুলকে প্রশ্ন করার পরামর্শ দিয়ে তিনি জানান, প্রকল্পের বরাদ্দ নিয়ে আসার সুবাদে সড়কটি উদ্বোধনের অধিকার তাঁর রয়েছে।
অন্যদিকে, উদ্বোধন-পরবর্তী আলোচনা সভায় হারুনুর রশীদ নতুন এমপিকে আরও সড়ক নির্মাণের জন্য বরাদ্দ নিয়ে আসার আহ্বান জানান। সড়কটি তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ ছিল এবং প্রকল্পটি বাস্তবায়নে তাঁর সহযোগিতা ছিল বলেও দাবি করেন তিনি। এ সময় এমপিকে কটাক্ষ করেও বক্তব্য দেন সাবেক এই এমপি।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সাধারণ সম্পাদক মনোয়ার হোসেন জুয়েল বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই এই আসনে রাজনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘনের ঘটনা দেখা যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে নেতা-কর্মীদের মধ্যে হাতাহাতির মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। এতে জেলার উন্নয়নের চেয়ে রাজনৈতিক শিষ্টাচার বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে সাধারণ মানুষও ভোগান্তিতে পড়ছেন এবং এলাকার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।
সড়ক নির্মাণের ঠিকাদার মো. সেলিম রেজা জানান, বর্তমান ও সাবেক দুই এমপির অনুষ্ঠানেই তিনি উপস্থিত ছিলেন। সরকারি বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা প্রকল্প পরিদর্শন বা তদারকিতে গেলে ঠিকাদার হিসেবে তাঁদের উপস্থিত থাকতে হয়। সে কারণেই তিনি দুই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন।
এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মো. আজহারুল ইসলাম বলেন, এলজিইডির পক্ষ থেকে সড়কটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়নি। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হলে সেখানে উদ্বোধনী ফলক স্থাপন করা হতো। বর্তমান ও সাবেক এমপি দুজনই মূলত কাজের তদারকি করতে গিয়েছিলেন। সরকারি বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা প্রকল্প পরিদর্শন বা তদারকিতে গেলে এলজিইডির কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত থাকেন। সড়কটির নির্মাণ প্রকল্পের মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।