হোম > সারা দেশ > বগুড়া

বগুড়ায় শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী কেল্লাপোশী মেলা

শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধি  

মেলা উপলক্ষে মাদারের লাঠিখেলার আয়োজন করা হয়। ছবি: আজকের পত্রিকা

বগুড়ার শেরপুর উপজেলার কুসুম্বী ইউনিয়নে বসেছে ঐতিহ্যবাহী কেল্লাপোশী মেলা। প্রতিবছরের মতো এবারও জ্যৈষ্ঠ মাসের দ্বিতীয় রোববার এই মেলা শুরু হয়। চলবে ছয় দিন পর্যন্ত। ইউনিয়নের কেল্লাপোশী এলাকায় কালু গাজীর আস্তানার চারপাশে এই মেলা জমে।

উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতির ইতিহাসে কেল্লাপোশী মেলা একটি অনন্য নাম। লোককথা ও জনশ্রুতি অনুযায়ী, কেল্লাপোশী মেলার সূচনা হয়েছিল ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে। সেই হিসেবে ২০২৬ সালে মেলাটি ৪৭০ বছরে পদার্পণ করেছে। মেলার উৎপত্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলা লোকসাহিত্যের বিখ্যাত গাজী-কালু-চম্পাবতীর কাহিনি। কিংবদন্তি অনুসারে, বৈরাটনগরের দরবেশ শাহ সেকেন্দারের রূপবান পুত্র গাজী মিয়া ও তাঁর পালিত ভাই কালু মিয়া রাজকীয় জীবন ত্যাগ করে ধর্ম প্রচারে বের হন। একপর্যায়ে তাঁরা বর্তমান বগুড়া অঞ্চলের ব্রাহ্মণনগরে এসে পৌঁছান। সেখানে ব্রাহ্মণ রাজা মুকুট রায়ের একমাত্র কন্যা চম্পাবতী গাজী মিয়ার প্রেমে পড়েন। গাজী মিয়ার পক্ষ থেকে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে কালু মিয়া রাজদরবারে গেলে রাজা ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে বন্দী করেন। ভাইকে উদ্ধারের জন্য গাজী মিয়া শেরপুরের কুসুম্বী এলাকায় একটি সামরিক দুর্গ নির্মাণ করেন। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, সেই ‘কেল্লা’ বা দুর্গ থেকেই পরে এলাকার নাম হয় ‘কেল্লাপোশী’। গাজী মিয়া ও রাজা মুকুট রায়ের বাহিনীর মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত গাজী মিয়া বিজয়ী হন। কালু মিয়াকে উদ্ধার করার পাশাপাশি তিনি চম্পাবতীকে বিয়ে করেন। এই বিজয় ও বিবাহ উৎসবকে কেন্দ্র করেই কেল্লাপোশীতে শুরু হয় আনন্দোৎসব, যা ধীরে ধীরে বার্ষিক লোকমেলায় রূপ নেয়।

এই মেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় অনুষঙ্গ হলো ‘মাদার খেলা’ বা ‘মাদারের লাঠিখেলা’। মেলা শুরু হওয়ার অন্তত পাঁচ দিন আগে থেকে শেরপুর ও আশপাশের গ্রামীণ জনপদে ঢাক-ঢোল, কাঁসর-ঘণ্টা আর লাঠিসোঁটার আওয়াজে শুরু হয় লোকজ আচার। মাদারের দল গ্রাম ঘুরে খেলা দেখিয়ে আমন্ত্রণ জানায় কেল্লাপোশী মেলার। মাদার খেলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইসলামের মারফতি ধারার বিখ্যাত সুফি সাধক হজরত সৈয়দ বদিউদ্দীন জিন্দা শাহ মাদার (রহ.)-এর অনুসারী ‘মাদারিয়া’ তরিকার প্রভাব। মাদার খেলায় ব্যবহৃত প্রতীকী বাঁশটিকে স্থানীয় মানুষ ‘মাদার পীরের দণ্ড’ বলে মনে করেন। খেলার শুরুতে ওস্তাদ বা প্রধান বয়াতি একটি নির্দিষ্ট বাঁশঝাড় থেকে এক কোপে সোজা বাঁশ কাটেন। পরে সেটিকে নদীতে গোসল করিয়ে লাল কাপড়ে মুড়িয়ে বিভিন্ন স্থানে মানুষের চুল বা চামর দিয়ে সাজানো হয়। এই সাজানো বাঁশ নিয়ে ১৫ থেকে ২০ জনের দল ঢাক-ঢোল বাজিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে লাঠিখেলা প্রদর্শন করে। দলটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে গান গায়, মাদার পীরের বন্দনা করে এবং মানুষের কাছ থেকে মানত ও দান সংগ্রহ করে।

গবেষকদের মতে, মাদার খেলার লাঠি চালনা ও শারীরিক কসরতের সঙ্গে ঐতিহাসিক ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলনেরও সম্পর্ক রয়েছে। অষ্টাদশ শতকে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে সংগঠিত ফকির বিদ্রোহের অন্যতম নেতা মজনু শাহ ছিলেন মাদারিয়া তরিকার অনুসারী। ধারণা করা হয়, মাদার খেলায় ব্যবহৃত লাঠি চালনা একসময় আত্মরক্ষামূলক ও সামরিক প্রশিক্ষণের অংশ ছিল। সময়ের পরিবর্তনে তা লোকজ খেলায় রূপান্তরিত হয়েছে।

কেল্লাপোশী মেলা বাংলার ধর্মীয় সমন্বয়বাদেরও একটি অনন্য উদাহরণ। এখানে মুসলমানদের পাশাপাশি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষও সমান উৎসাহে অংশ নেন। গাজী মিয়া, মাদার পীর, চম্পাবতী কিংবা কালু মিয়া—সব চরিত্রই স্থানীয় লোকবিশ্বাসে একধরনের সামষ্টিক ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে।

স্থানীয়ভাবে মেলা নিয়ে একটি জনপ্রিয় ছড়া এখনো প্রচলিত আছে—

‘কেল্লাপোশী মেলার রাজা

মাদার পীরের চামর পূজা

মেলা নয়তো ঠেলার বাজার

লোক জমে যায় হাজার হাজার।’

এই মেলার সবচেয়ে বৈশিষ্ট্যময় দিক হলো এর ‘জামাইবরণ’ সংস্কৃতি। জ্যৈষ্ঠ মাসের এই উৎসবকে কেন্দ্র করে গ্রামের বিবাহিত মেয়েদের বাপের বাড়িতে আসার রেওয়াজ রয়েছে। তাঁদের জামাইদের বিশেষভাবে নিমন্ত্রণ করা হয়। শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে জামাতাকে ‘সেলামি’ দেওয়া হয়, যাতে তাঁরা মেলা ঘুরতে পারেন। জামাতারা মেলা থেকে বড় বড় মাছ, খাসি, মাটির পাতিলে ভরা মিষ্টি কিংবা অন্যান্য উপহার কিনে শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে আসেন।

কেল্লাপোশী মেলা উত্তরবঙ্গের গ্রামীণ অর্থনীতিরও একটি বড় কেন্দ্র। এবারও মেলায় স্থানীয় কুটির শিল্প, কারুশিল্প ও কৃষিনির্ভর পণ্যসামগ্রীর পসরা বসেছে। মেলায় উন্নতমানের কাঠের খাট, আলমারি, চেয়ার-টেবিলসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র বিক্রি হয়। স্থানীয় কারিগরেরা সারা বছরের প্রস্তুতি নিয়ে এই মেলায় পণ্য নিয়ে আসেন। এ ছাড়া মেলায় বিশাল আকারের মাছ ও বড় বড় মিষ্টির সমাহার বিশেষ আকর্ষণ সৃষ্টি করে। প্রতিবছর যমুনা নদী ও চলনবিল অঞ্চল থেকে আনা ১০ থেকে ২০ কেজি ওজনের মাছ এবং ৫ থেকে ১০ কেজির মিষ্টি মেলার আলাদা পরিচিতি তৈরি করে। গতকাল রোববার মেলার প্রথম দিনে ১২ কেজির মাছ উঠতে দেখা যায়। মিষ্টি ছিল দুই কেজি ওজনের। আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে মেলা আরও জমে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।

দিনাজপুরের বীরগঞ্জ থেকে এসেছেন আলতাব হোসেন। তিনি মেলায় খেলনার দোকান নিয়ে বসেছেন। আলতাফ হোসেন বলেন, ‘আমি প্রতিবছর এই মেলায় আসি। খেলনা বিক্রি করে আমার সংসার চলে। তবে এই মেলায় দোকান বসাতে প্রতি হাত জায়গার জন্য এক হাজার টাকা করে দিতে হয়। এবার সাত হাত জায়গার জন্য সাত হাজার টাকা দিতে হবে। সঙ্গে এক হাজার টাকা খাজনা দিতে হবে।’

কালু গাজীর আস্তানাকে ঘিরে মেলার আয়োজন হলেও বঞ্চিত সেখানকার ভক্তরা। এমনই একজন ভক্ত শহিদুল ইসলাম দিপু বলেন, ‘মেলাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর একটা করে কমিটি হয়। সে কমিটি লাখ লাখ টাকা আদায় করলেও আমরা কোনো সুবিধা পাই না। আস্তানারও কোনো উন্নতি হয় না।’

মেলাকে ঘিরে জুয়া ও অশ্লীল নৃত্যের অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী। আমন গ্রামের ফজলুর রহমান বলেন, ‘আগে মেলায় সার্কাস, যাত্রাপালা হতো, আমরা সবাই মিলে উপভোগ করতাম; কিন্তু এখন যাত্রাপালা নেই। বিচিত্র অনুষ্ঠানের নামে অশ্লীল নৃত্য চলে। প্রকাশ্যে বসে জুয়ার আসর। এসব কারণে স্থানীয় যুবকেরা অধঃপতিত হচ্ছে।’ এলাকাবাসী মনে করেন, প্রশাসন সঠিকভাবে তত্ত্বাবধান করলে চার শতকের বেশি সময় ধরে টিকে থাকা এই মেলা আবারও তার আদি রূপ ফিরে পাবে।

শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, এবারের মেলায় কোনো ধরনের অশ্লীলতা ও জুয়া চলতে দেওয়া হবে না। আইশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

বগুড়ায় বাসচাপায় ভ্যানযাত্রী মা-মেয়ে নিহত

চোর চিনে ফেলায় গলা কেটে হত্যা, গ্রেপ্তার ২

বগুড়ায় মোটরসাইকেলে ট্রাকের ধাক্কা, বাবা-মেয়ে নিহত, মায়ের অবস্থা গুরুতর

‘মাদকে জড়িত পুলিশ সদস্যদের চাকরিচ্যুত করে শিক্ষিত বেকারদের সুযোগ দেওয়া হবে’

অনৈতিক সম্পর্কের জেরে আত্মহত্যার চেষ্টাকারী এএসআই রবিউলের মৃত্যু

বগুড়ায় ইয়াবাসহ ২ পুলিশ সদস্য আটক

বগুড়ায় ‘রহস্যজনক আগুনে’ পুড়ে মায়ের পর মারা গেল মেয়ে

বগুড়ায় রহস্যজনক আগুনে পুড়ে নারীর মৃত্যু, মেয়ে দগ্ধ

বগুড়া পুলিশ লাইনসে এএসআইয়ের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

ধুনটে ঝড়ে উপড়ে পড়ল শতবর্ষী বটগাছ, দুই ইউনিয়নের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন