পবিত্র ঈদুল আজহা আগামী বৃহস্পতিবার। কিন্তু অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বোরো ফসল হারিয়ে সুনামগঞ্জের লক্ষাধিক কৃষকের ঘরে নেই উৎসবের আমেজ। খোরাকের ধান বাঁচাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে সরকারি সহায়তার তালিকায় অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ নতুন করে ক্ষোভ বাড়িয়েছে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে। অভিযোগ উঠেছে, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের বাদ দিয়ে জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় নেতা-কর্মীদের স্বজন-পরিচিতদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে সহায়তার তালিকায়।
কৃষি বিভাগের মতে, জেলায় বোরোচাষি প্রায় ৪ লাখ। তাঁদের মধ্যে কার্ডধারী কৃষক ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৭ জন এবং ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক ২ লাখ ২৩ হাজার ৮০৭ জন। তাঁদের অধিকাংশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে দাবি কৃষক ও হাওর আন্দোলনের নেতাদের।
জানা যায়, সুনামগঞ্জে জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা প্রস্তুত করা হয় ১ লাখ ২৯ হাজার ৫৫৯ জনের। তালিকায় সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় ৯ হাজার ২৫৯, শান্তিগঞ্জে ৫ হাজার ৪০৫, দোয়ারাবাজারে ২ হাজার ৭৯, বিশ্বম্ভরপুরে ৫ হাজার ৭৩১, জগন্নাথপুরে ৭ হাজার ২০৫, জামালগঞ্জে ১০ হাজার ২০৬, তাহিরপুরে ১৮ হাজার ৩১৭, ধর্মপাশায় ২৫ হাজার ৪০৯, ছাতকে ২ হাজার ১৮৭, দিরাইয়ে ২৩ হাজার ৫১১ ও শাল্লা উপজেলায় ২০ হাজার ২৫০ জনের নাম ছিল। প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ১ লাখ ২৯ হাজার ৫৫৯ জনের ক্ষতিগ্রস্ত তালিকা থেকে সহায়তার জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে ৬৪ হাজার ৩৮৪ জন কৃষকের নাম। প্রতিজনকে ৩ হাজার টাকা ও ১৫ কেজি চাল তিন মাস দেওয়া হবে।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার রাধানগর গ্রামের কৃষক রাসেল আহমদ বলেন, ‘প্রায় দুই হাল (২৪ কিয়ার) জমি করছি। কয়েক কিয়ার তলাইছে। কিছু জমি আধাআধি কাটছি, নষ্ট হইছে অনেকতাই। তারপরও আমরা ক্ষতিগ্রস্ত না। যারা মোটরসাইকেল চালায়, বাজারে জমা তুলে, জমিজমা করছে না, তারা কৃষক। মেম্বারের সাথে মিল থাকায় তাদের নাম উঠছে তালিকায়। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত অনেকে বাদ পড়ছেন।’
মধ্যনগর উপজেলার উত্তর বংশীকুন্ডা ইউনিয়নের রূপনগর গ্রামের কৃষক নরকুল ইসলাম বলেন, ‘টাঙ্গুয়ার হাওরের আশপাশে যারা জমি করছে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হইছে। অনেক গ্রাম আছে, টাঙ্গুয়ার হাওরে জমিজমা নাই। এই গ্রামের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় নাই, কিন্তু তাদের নাম আছে। মেম্বার-চেয়ারম্যানদের ঘনিষ্ঠজনেরা সরকারি-বেসরকারি সব অনুদানই পাইতাছে। কোনো কিছুতেই আমরার নাম নাই।’
সুনামগঞ্জ হাওর বাঁচাও আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্তদের বাদ দিয়ে জমিজমা করেনি, তাদের নাম যুক্ত হয়েছে সরকারি প্রণোদনার তালিকায়। অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে এ রকমটা করা হচ্ছে। যাঁরা অন্যের জমি বর্গা চাষ করেছেন, তাঁদের নাম নেই। আবার যাঁরা জমি করেননি, তাঁরা তালিকাভুক্ত। প্রভাবমুক্ত থেকে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের অনুদান দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’
তালিকা প্রণয়নে অনিয়মের অভিযোগ আছে, তবে কেউ লিখিত অভিযোগ করেননি উল্লেখ করে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মতিউর রহমান খান বলেন, ‘আমরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সুপারিশক্রমে তালিকা করার নির্দেশনা পেয়েছি। সে অনুযায়ী ১ লাখ ২৯ হাজার ৫৫৯ জনের তালিকা পাঠানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৬৪ হাজার ৩৮৪ জনের তালিকা অনুমোদিত হয়েছে।’
টানা অতিবৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে ৬ লাখ ৪৮ হাজার ৩৫১ টন বোরো ধান ঘরে তুলতে পেরেছেন কৃষক। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ লাখ ৪৪ হাজার ৪৬৪ টন। সে হিসাবে ৯৬ হাজার ১১৩ টন ধান উৎপাদন কম হয়েছে। একইভাবে চাল উৎপাদন হয়েছে ৪ লাখ ৩২ হাজার ২৩৪ টন; লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৩০৯ টন। চল উৎপাদন কম হয়েছে ৬৪ হাজার ৭৫ টন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাদিকুর রহমান জানান, ২৫ মে পর্যন্ত হাওরে শতভাগ আর নন-হাওরে ৯৯ ভাগ ধান কাটা শেষ হয়েছে।
এদিকে ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজ ইতিমধ্যে শেষ হলেও বিপত্তি বেধেছে শুকানোর প্রক্রিয়া নিয়ে। প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টি নামায় কৃষক তাঁদের কষ্টের ফসল কোনোভাবেই শুকাতে পারছেন না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এবার হাওরের কৃষকের ঘরে উঠেছে অতিবৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে নষ্ট হওয়া কালচে ও আধা পচা ধান। প্রকৃতির এই রুদ্ররূপে কিশোরগঞ্জে বোরো ধানের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২৭৮ কোটি টাকার, যা সরাসরি আঘাত হেনেছে ৫২ হাজার ৯৮০ জন কৃষকের জীবনে।
উপপরিচালক সাদিকুর বলেন, ‘মাঠপর্যায়ের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে, যা যাচাই-বাছাই শেষে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।’
এদিকে সাইফুল আরিফ জুয়েল, নেত্রকোনা জানান, নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের কৃষকদের ঘরে নেই উৎসবের আমেজ। পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা ও বিএডিসির মিশ্রণ বীজে জেলার হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাওরের কৃষকদের বছরে একমাত্র ফসল বোরো ধান। এই ফসলের ওপর সারা বছরের বাজার খরচ, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, চিকিৎসার ব্যয় এবং সকল আচার অনুষ্ঠান নির্ভর করে।
ফসলহানির এই আঁচ লেগেছে কোরবানির পশুর হাটে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার গরু-ছাগলের দাম অর্ধেকে নেমে এসেছে।
মোহনগঞ্জ উপজেলার গাগলজুর এলাকার কৃষক গোলাপ মিয়া বলেন, ‘জলাবদ্ধতার কারণে ৩ একর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এবার কোরবানি তো দূরে থাক, খেয়ে বাঁচাই দায়। মনে শান্তি না থাকলে ঈদের আনন্দ কোথায় থেকে আসবে।’