হোম > শিল্প-সাহিত্য

স্মৃতি, প্রকৃতি ও ইতিহাসের খোঁজে দুবাইয়ে বাংলাদেশ-ভারত–পাকিস্তানের ৩ শিল্পীর প্রদর্শনী

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

সরকার প্রতীকের তোলা ছবি জুলাই অভ্যুত্থানের সময়কার একটি দৃশ্য। ছবিটি রাজধানীর কারওয়ানবাজারে তোলা। ছবি: সরকার প্রতীক

শিল্পের কাজ কী? এই প্রশ্নটি বারবার ফিরে আসে ‘The sky held it, the earth remembered’ (আকাশ তাকে ধরে রেখেছে, পৃথিবী মনে রেখেছে) শীর্ষক প্রদর্শনীতে। যদিও প্রদর্শনীটি কখনো সরাসরি এই প্রশ্নের উত্তর দেয় না।

দুবাইয়ের ইশারা আর্ট ফাউন্ডেশনে শিল্পী শাহানা রাজানি, রোহিণী দেবাশের এবং সরকার প্রতীক তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জায়গা থেকে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁদের একজনের কাজ সিন্ধু বদ্বীপের পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া একটি গ্রামকে ঘিরে, অন্যজনের কাজ ঢাকার এমন এক শহরকে নিয়ে, যা প্রতিদিন একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে। আর তৃতীয়জনের কাজ সূর্যের পৃষ্ঠে ঘটে চলা বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে। তাঁদের কাজের মধ্যে যোগসূত্রটি প্রথম দেখায় স্পষ্ট হয় না। সেই সম্পর্ক খুঁজে বের করার দায়িত্ব দর্শকের ওপরই ছেড়ে দিয়েছে প্রদর্শনীটি।

ইশারা আর্ট ফাউন্ডেশন ও হান নেফকেন্স ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশের শিল্পীদের কাজ একত্র করা হয়েছে। এর মূল ভাবনা হলো—ভূমি, জল ও মহাবিশ্ব আমাদের স্মৃতি ও ইতিহাসের জীবন্ত ভান্ডার হিসেবে কাজ করে। প্রদর্শনীর কিউরেটরদের মতে, পরিবেশের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে ঘটে যাওয়া পরিবেশগত পরিবর্তনের নানা বস্তুগত চিহ্ন জমা থাকে। এসব চিহ্ন কখনো পানির নিচে চাপা পড়ে যায়, কখনো আড়ালে চলে যায়, আবার কখনো মানুষের চোখে ধরা পড়ার ক্ষমতারও বাইরে থাকে।

পাকিস্তানি শিল্পী শাহানা রাজানির তুলিতে পানি তলিয়ে যাওয়া গ্রামের স্মৃতিতে আঁকা দেওয়াল চিত্র। ছবি: সংগৃহীত

এই প্রদর্শনীর কেন্দ্রে রয়েছে করাচিভিত্তিক শিল্পী শাহানা রাজানির ‘Lines That World a River’ শীর্ষক কাজ। হান নেফকেন্স ফাউন্ডেশনের দক্ষিণ এশীয় ভিডিও আর্ট প্রোডাকশন গ্রান্টের প্রথম প্রাপক তিনি। এটি তিনটি পর্দায় দেখানো এক চলচ্চিত্র। এর বিস্তৃত সংস্করণ তৈরি হয়েছে ‘Four Acts of Recovery’ নামের সেই কাজের ভিত্তিতে, যা ওই অনুদানের আওতায় নির্মিত হয়েছিল।

সিন্ধু বদ্বীপের যেসব মানুষ বাঁধ ও ব্যারাজ নির্মাণের কারণে নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন, তাঁদের নিয়ে এই চলচ্চিত্র। সেখানে স্থানীয় মানুষ ছবি এঁকে পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া নিজেদের গ্রামগুলোকে আবার কল্পনায় গড়ে তোলেন। তাঁদের আঁকা ছবিতে দেখা যায় বাড়িঘর, নৌকা, এঁকেবেঁকে চলা খাল এবং দরগা বা মাজার। এগুলো এমন এক হারিয়ে যাওয়া ভূদৃশ্যের ছবি, যেখানে মানুষ একসময় বসবাস করতেন, কিন্তু এখন আর আগের মতো সেখানে ফিরে গিয়ে থাকতে পারেন না।

ভিডিওতে গ্রামের একজন মানুষকে বলতে শোনা যায়, ‘এই দেয়ালচিত্রগুলো যখন দেখি, তখন মনে হয় আমরা যেন ছবিগুলোর ভেতরেই বাস করছি। জমিটা আবার জীবন্ত হয়ে উঠেছে।’

এই মুহূর্তটি ছবি আঁকা এবং শিল্পের অর্থ সম্পর্কে আমাদের ভাবনার ধরন বদলে দেয়। যাঁরা এসব ছবি আঁকেন, তাঁদের কাছে দেয়ালচিত্রগুলো কেবল কোনো কিছুর ছবি নয়। এগুলো হারিয়ে যাওয়া জায়গায় ফিরে যাওয়ার একটি পথ। যে ভূখণ্ড পানির নিচে তলিয়ে গেছে এবং যেখানে আর আগের মতো পৌঁছানো সম্ভব নয়, সেই ভূখণ্ডকে ছবির মাধ্যমে আবার বর্তমানের মধ্যে ফিরিয়ে আনা যায়।

আমরা সাধারণত ছবি বা চিত্রকর্মকে কোনো কিছুর প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখি। অর্থাৎ, ছবি এমন কোনো বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দেয়, যা ছবির বাইরে অবস্থিত। কিন্তু এই প্রদর্শনীতে ছবির সঙ্গে বাস্তব জীবনের দূরত্ব বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন শিল্প কী করতে পারে, সেই প্রশ্নের পরিসর গ্যালারির দেয়ালের বাইরেও অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে যায়।

শাহানা রাজানির কাজের গঠনও এই ভাবনাকে আরও জোরালো করে। তিনটি পর্দার মাঝখানে এমন একটি ঘেরা কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, যা দরগার কথা মনে করিয়ে দেয়। এর মাধ্যমে সেই সব দরগার কথা তুলে ধরা হয়েছে, যেগুলো আশপাশের জনবসতি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পরও টিকে থাকে।

গ্যালারিতে দর্শকদের ওই কাঠামোর ভেতরে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়। ফলে দরগাটি একই সঙ্গে একটি স্থাপত্যের স্মারক এবং অনুপস্থিতির প্রতীক হয়ে ওঠে। এটি এমন একটি কাঠামো, যা টিকে আছে, অথচ যার চারপাশের জগৎ আর আগের মতো নেই।

রোহিণী দেবাশেরের ‘Latent Fields’ শীর্ষক কাজ দর্শককে প্রায় অকল্পনীয় দূরত্বে নিয়ে যায়। বিশাল আকারের তিনটি রেশমি প্যানেলে সূর্যের কালো দাগ বা সানস্পট এবং সূর্যের অন্যান্য ঘটনার ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এসব ছবি তৈরি করতে তিনি আঁকাআঁকি, অ্যাসিড দিয়ে কাপড়ের পৃষ্ঠের পরিবর্তন ঘটানো, উঁচু-নিচু নকশা তৈরি, ধোঁয়ার সাহায্যে ছাপ তৈরি, আলোকচিত্র এবং ডিজিটাল প্রিন্টিংয়ের মতো বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন।

দেবাশেরের শিল্পচর্চা শিল্প ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের মাঝামাঝি জায়গায় দাঁড়িয়ে। তাঁর কাজের মূল প্রশ্ন হলো, যেসব ঘটনা সরাসরি দেখা বা অনুভব করা সম্ভব নয়, সেগুলোকে আমরা কীভাবে পর্যবেক্ষণ করি? এই প্রদর্শনীতে যে ঘটনাগুলোকে নথিবদ্ধ করা হচ্ছে, সেগুলো এমন এক বিশাল পরিসরে ঘটে, যা মানুষের খালি চোখের স্বাভাবিক দেখার ক্ষমতার বাইরে।

অন্যদিকে, সরকার প্রতীকের ‘Dhaka 1217’ সিরিজ দর্শকের দৃষ্টিকে আবার শহরের দিকে ফিরিয়ে আনে। তবে এখানে শহরকে দেখা হয়েছে অত্যন্ত ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে। এই সিরিজে রয়েছে ১৩৫টি সাদা-কালো আলোকচিত্র। ২০১১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ছবিগুলো তোলা হয়েছে ঢাকার সেই পাড়ায়, যেখানে প্রতীক জন্মেছেন এবং এখনও বসবাস করেন।

ছবিগুলোতে দেখা যায়, নতুন নতুন নির্মাণকাজ কীভাবে পার্ক, লেক ও সবুজ গাছপালার জায়গা দখল করে নিচ্ছে। একই সঙ্গে রেলপথ ও রেল অবকাঠামোর বিস্তার ধীরে ধীরে পুরোনো ভূদৃশ্যকে আড়াল করে দিচ্ছে। শহরের এই বড় পরিবর্তনগুলোর পাশাপাশি ছবিতে ধরা পড়েছে ব্যক্তিগত জীবনের আরও ছোট ছোট চিহ্ন। কোথাও পড়ে থাকা চুল, কোথাও পুরোনো একটি ছবি, আবার কোথাও ধুলোমাখা বই।

এই তিন শিল্পীর কাজের মধ্যে মূল যোগসূত্র হলো একটি প্রশ্ন: পরিবর্তনের পর কী কী চিহ্ন থেকে যায়, আর আমরা কীভাবে সেগুলো চিনতে পারি?

পানিতে তলিয়ে যাওয়া একটি গ্রাম টিকে থাকে মানুষের আঁকা ছবির স্মৃতিতে। বদলে যেতে থাকা একটি পাড়ার রূপ ধরা পড়ে একের পর এক আলোকচিত্রে। আর খালি চোখে দেখা যায় না, এমন মহাজাগতিক ঘটনাও বৈজ্ঞানিক ও শৈল্পিক পদ্ধতির সাহায্যে ছবির মাধ্যমে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

প্রদর্শনীটি আমাদের সামনে বিভিন্ন চিহ্ন তুলে ধরে, কিন্তু সেগুলো দিয়ে ঠিক কী করতে হবে, তা সব সময় বলে দেয় না। বরং দর্শকদের বলা হয়, কী হারিয়ে গেছে, কী বদলে গেছে এবং কী এখনও টিকে আছে, সেদিকে মনোযোগ দিতে। এভাবে দর্শককে ব্যক্তিগত স্মৃতি, পরিবেশগত পরিবর্তন এবং মানুষের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতার বাইরের বিশাল সময়ের পরিসরের মধ্যে যাতায়াত করতে হয়। দর্শক নিজেও তখন এক ধরনের সংরক্ষণাগার তৈরির কাজে অংশ নেন। তিনি বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন চিহ্ন একত্র করেন এবং সেগুলো আসলে কী বলছে, তা বোঝার চেষ্টা করেন।

এভাবেই আমরা আবার ফিরে আসি সেই প্রশ্নে: শিল্প আসলে কীসের জন্য? প্রথম দেখায় ‘The sky held it, the earth remembered’—প্রদর্শনীটিকে পরিবেশের অবক্ষয় ও প্রকৃতির ধ্বংস নিয়ে আয়োজিত অসংখ্য প্রদর্শনীর আরেকটি বলে মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরভাবে তাকালে এর আসল বক্তব্য ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেটি লুকিয়ে আছে দেখার প্রক্রিয়ার মধ্যেই। পরিবর্তনের পর কী টিকে থাকে? কী অদৃশ্য হয়ে যায়? আর আমরা কীভাবে বুঝতে পারি, সেখানে একসময় কী ছিল?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার মধ্য দিয়েই প্রদর্শনীটি শিল্পের ভূমিকা সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখায়। শিল্প হয়তো শুধু বাস্তবতাকে তুলে ধরে না। কখনো কখনো তা হারিয়ে যাওয়া বাস্তবতাকে স্মৃতির মধ্যে বাঁচিয়ে রাখে, অদৃশ্য হয়ে যাওয়া ইতিহাসের চিহ্ন খুঁজে বের করে এবং আমাদের চোখের সামনে থাকা পরিবর্তনগুলোকে নতুন করে চিনতে সাহায্য করে।

ইয়োকোহামায় শিল্পী কামরুল হাসান লিপুর একক চিত্র প্রদর্শনী

জগজিৎ সিংয়ের শ্রদ্ধায় অ্যালিয়ঁস ফ্রঁসেজে গজলসন্ধ্যা

ছায়ানটে শিশুদের কলকাকলিতে পূর্ণ শরতের উৎসব

সমকালীন সাহিত্যের নতুন ধারা সৃষ্টির জন্য নোবেল পেলেন কানাডীয় সাহিত্যিক অ্যান কারসন

মুস্তাফা মনোয়ারের শিল্পজগৎ: পাপেট বাড়ির ‘বাসিন্দাদের’ ভবিষ্যৎ নিয়ে দুর্ভাবনা

ঢাবি চারুকলায় একক চিত্র প্রদর্শনী ‘মুক্তির সংগ্রামে অনুভবের বৈভব’

স্বীকৃতি পেল ইসলামপূর্ব আরবের কবিতায় মৌমাছি, যুদ্ধ ও আত্মগরিমার গল্প

শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেন আর নেই

মায়ের কবরে শায়িত শিশুসাহিত্যিক আমীরুল ইসলাম

শিল্পকলায় চলচ্চিত্র নিয়ে ৪টি মাস্টারক্লাস, ৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আবেদন