পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় বহুল প্রতীক্ষিত শান্তি আলোচনায় বসতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের প্রস্তাবকে আলোচনার ‘ভিত্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, তবুও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে দুই পক্ষের মধ্যে এখনো পাহাড়সম দূরত্ব ও গভীর মতভেদ রয়ে গেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদে জাহাজ চলাচলের অধিকার এবং লেবাননে ইসরায়েলের যুদ্ধ—এই দুটি বিষয় সমাধানের ওপরই নির্ভর করছে আলোচনার ভবিষ্যৎ। আর এই আলোচনার ফলাফল আগামী কয়েক প্রজন্মের জন্য বদলে দিতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক রূপরেখা।
ইরানি প্রতিনিধিদল তেহরানের দেওয়া ১০ দফা প্রস্তাব নিয়ে ইসলামাবাদে আসছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের রয়েছে ১৫ দফার একটি আলাদা পরিকল্পনা। এই দুই পরিকল্পনার মধ্যে সামঞ্জস্য খুবই সামান্য, যা নির্দেশ করে যে দুই পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান ঘোচাতে হবে।
দুটি বড় মতভেদ নিচে তুলে ধরা হলো—
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ: ইরানের ১০ দফার প্রস্তাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের এখতিয়ার রাখার দাবি রয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এটি নিয়ে কোনো আপস করা হবে না এবং এটি নিয়ে আলোচনারও সুযোগ নেই।
ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি: ইরানের ১০ দফায় তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। অথচ ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার কমিয়ে আনতে হবে। তেহরান অবশ্য তাদের এই শক্তিশালী অস্ত্রাগারকে আলোচনার বাইরে রাখার বিষয়ে অনড়।
পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মতে, ইরান হয়তো যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন, ক্ষতিপূরণ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে সুবিধা পেতে পারে। তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের এখতিয়ার পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
আলোচনার কেন্দ্রে হরমুজ প্রণালি ও জ্বালানি সংকট
আগে পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যু আলোচনার শীর্ষে থাকলেও এখন সব ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান এই জলপথটি বন্ধ করে রেখেছে। এর ফল হিসেবে বিশ্ব ইতিহাসে জ্বালানি সরবরাহে সবচেয়ে বড় নেমে এনেছে এবং তেলের দাম বেড়ে গিয়েছে।
তেহরান ইঙ্গিত দিয়েছে, একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির আওতায় তারা হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে ‘ফি’ বা টোল আদায় করতে চায়। তবে ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, ইরান যদি পূর্ণ যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ খুলে দিতে রাজি না হয়, তবে দেশটিকে ধ্বংস করে দেওয়া হবে। অন্যদিকে, এখন পর্যন্ত ইরান এই জলপথের অবরোধ তুলে নেওয়ার কোনো লক্ষণই দেখায়নি।
চুক্তির মূল শর্তাবলি ও বৈপরীত্য
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ১০ দফা পরিকল্পনায় নীতিগতভাবে সম্মতি দিয়েছে। এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে—পরস্পরকে আক্রমণ না করা, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের স্বীকৃতি, সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জাতিসংঘ ও আইএইএ-র সব প্রস্তাব বাতিল, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং লেবাননের হিজবুল্লাহসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করা।
বিপরীতে, ট্রাম্পের ১৫ দফার প্রস্তাবে বলা হয়েছে—ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত সরিয়ে ফেলা, সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের (হুতি, হিজবুল্লাহ) অর্থায়ন বন্ধ করা।
শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা ও বর্তমান পরিস্থিতি
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জয়ের ঘোষণা দিলেও যুদ্ধের শুরুতে তিনি যে লক্ষ্যগুলো নির্ধারণ করেছিলেন—যেমন ইরানের আক্রমণ করার ক্ষমতা পুরোপুরি শেষ করা, পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা এবং সরকারকে উৎখাত করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা। র কিন্তু এর কোনোটিই অর্জিত হয়নি। ইরানও বড় কোনো ছাড় দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে না। তারা মনে করছে, হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে এমন এক অর্থনৈতিক সুবিধা দিয়েছে, যা দিয়ে তারা দীর্ঘ সময় লড়াই চালিয়ে যেতে পারবে।
ইসরায়েলের অবস্থান ও লেবানন সংকট
ইসরায়েল ইরানকে তাদের অস্তিত্ব রক্ষার হুমকি হিসেবে দেখে এবং তারা ইরানি শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন চায়। বর্তমানে যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে লেবানন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বলছে, লেবানন এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত নয় এবং তারা সেখানে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাবে।
বিপরীতে, ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও তেহরান জানিয়েছে, লেবাননে হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত কোনো চুক্তি হবে না। লেবাননে শত্রুতা বন্ধ হওয়াকে তেহরান ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তির অপরিহার্য শর্ত হিসেবে ঘোষণা করেছে।