২০২৩ সালের নভেম্বরে ক্ষমতায় আসার পর থেকে আশানুরূপ সফলতা দেখাতে না পারায় মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে বেশ নাজুক অবস্থানে রয়েছেন। সম্প্রতি দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত একটি গণভোট ও ৪ এপ্রিলের মেয়র নির্বাচনে বড় ধরনের পরাজয় তাঁর নেতৃত্বের দুর্বলতাকে প্রকাশ করে দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট মুইজ্জু ২০২৮ সালে একই দিনে প্রেসিডেন্ট ও সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি গণভোটের ডাক দিয়েছিলেন। প্রস্তাব অনুযায়ী, বর্তমান সংসদের মেয়াদ ২০২৯ সালের মে মাস থেকে কমিয়ে ২০২৮ সালের ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত করার কথা ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতা কুক্ষিগত করতেই মুইজ্জু এই কৌশল নিয়েছিলেন। ফলে মুইজ্জুর দল পিপলস ন্যাশনাল কংগ্রেস (পিএনসি) জোরালো প্রচারণা চালালেও জনগণ তা প্রত্যাখ্যান করে এবং বিপুল ভোটে হেরে যায় মুইজ্জুর সরকার (প্রায় ৬৮ দশমিক ৭ শতাংশ ‘না’ ভোট আর মাত্র ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট)।
এ আগে ৪ এপ্রিলের স্থানীয় নির্বাচনেও মুইজ্জুর দল পিএনসি পাঁচটি সিটি মেয়র পদের সব কটিতে বিরোধী দল মালদ্বীপ ডেমোক্রেটিক পার্টির (এমডিপি) কাছে পরাজিত হয়েছে। মালেসহ বড় শহরগুলোয় (যেখানে দেশের অর্ধেকের বেশি জনসংখ্যা বাস করে) এই পরাজয় ক্ষমতাসীন দলের জন্য বড় ধাক্কা। তবে সামগ্রিক কাউন্সিল আসনের দিক থেকে পিএনসি (২১৬-২২০টি আসন) এমডিপির (২০৭টি আসন) চেয়ে কিছুটা এগিয়ে রয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারণায় সরকারি সম্পদ, চাকরির প্রলোভন এবং শেষ মুহূর্তে প্রকল্প ঘোষণার মতো কৌশল ব্যবহার করেও শহুরে ভোটারদের মন জয় করতে পারেনি সরকার। ভোটাররা আবাসন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মতো মৌলিক ইস্যুগুলোকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।
এদিকে নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর গতকাল মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছেন মুইজ্জু। তিনি ২০ জন মন্ত্রীর মধ্যে ১০ জনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন এবং মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা কমিয়ে ১৫টি করেছেন। তবে পুনর্গঠিত এই মন্ত্রিসভায় প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদটি এখনো শূন্য রয়েছে।
মালদ্বীপ বর্তমানে ক্রমবর্ধমান ঋণের চাপের মুখে রয়েছে। দেশটির অর্থনীতিবিদদের মতে, অপরিকল্পিত ব্যয় ও ড্রোনসহ সামরিক সরঞ্জাম কেনায় বিপুল অর্থ খরচ করার ফলে ঋণের বোঝা বেড়েছে। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাত অবহেলার শিকার হচ্ছে।
সম্প্রতি সরকার ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সভেরেইন সুকুক (ও প্রায় ২৫ মিলিয়ন ডলার মুনাফা) নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই পরিশোধ করেছে। কর্মকর্তারা একে সুশৃঙ্খল আর্থিক ব্যবস্থাপনা হিসেবে দাবি করলেও বিশ্লেষকেরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাঁদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য সংরক্ষিত ‘সভেরেন ডেভেলপমেন্ট ফান্ড’ (এসডিএফ) ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে এই অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি দেখা দিতে পারে এবং নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে পারে।
সংসদে ক্ষমতাসীন দলের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও বিতর্কিত দলত্যাগবিরোধী আইনের ওপর মুইজ্জুর ক্ষমতা টিকে আছে। এই আইনের কারণে কোনো সংসদ সদস্য দল বদল করলে বা দল থেকে বহিষ্কৃত হলে আসন হারান। আইনটি বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে এবং এর রায়ের ওপর মুইজ্জুর সংসদীয় নিয়ন্ত্রণ নির্ভর করছে।
এদিকে বিরোধী দল এমডিপি সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও দলটির ভেতরেই রয়েছে অভ্যন্তরীণ বিভক্তি। সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ, ইব্রাহিম সলিহ ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল্লাহ শহিদ—এই তিন প্রভাবশালী নেতার মধ্যে নেতৃত্বের লড়াই বিরোধী জোটকে দুর্বল করতে পারে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।