দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত অবস্থানে অবস্থিত পাকিস্তান ঐতিহাসিকভাবেই বিশ্ব ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের কারণে দেশটি বারবার জটিল আন্তর্জাতিক সংকটে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বর্তমান মার্কিন-ইরান শান্তি আলোচনায় পাকিস্তানের ভূমিকা এই দীর্ঘ কূটনৈতিক ঐতিহ্যেরই একটি ধারাবাহিকতা।
১. চীন-মার্কিন সম্পর্কোন্নয়ন (১৯৭১) : কিসিঞ্জারের গোপন সফর
পাকিস্তানের কূটনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্র এবং গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের মধ্যে বরফ গলানো। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সহায়তায় মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার ইসলামাবাদ থেকে একটি গোপন ফ্লাইটে বেইজিং সফর করেন।
ফলাফল: এই মধ্যস্থতার ফলে কয়েক দশকের বৈরিতার অবসান ঘটে এবং ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের ঐতিহাসিক চীন সফরের পথ প্রশস্ত হয়। এটি স্নায়ুযুদ্ধের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।
২. জেনেভা চুক্তি (১৯৮৮) : আফগান সংকট নিরসন
আশির দশকে আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের সময় পাকিস্তান শুধু প্রতিরোধেই ভূমিকা রাখেনি, বরং যুদ্ধ অবসানে কূটনৈতিকভাবেও সক্রিয় ছিল।
ফলাফল: পাকিস্তানের মধ্যস্থতা এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ ১৯৮৮ সালের জেনেভা চুক্তিতে পৌঁছাতে সাহায্য করে, যা আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহারের পথ সুগম করে।
৩. মার্কিন-তালেবান শান্তিচুক্তি (২০২০) : দোহা প্রক্রিয়া
আফগানিস্তানে দীর্ঘ দুই দশকের যুদ্ধের অবসানে পাকিস্তানের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। ওয়াশিংটনের অনুরোধে পাকিস্তান তালেবান নেতাদের আলোচনার টেবিলে আনতে সক্ষম হয়।
ফলাফল: ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাতারের দোহায় ঐতিহাসিক মার্কিন-তালেবান শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই মধ্যস্থতা ছাড়া আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার প্রায় অসম্ভব ছিল।
৪. মুসলিম বিশ্বে ঐক্যের প্রচেষ্টা
ওআইসির অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে পাকিস্তান বিভিন্ন সময় মুসলিম দেশগুলোর মধ্যকার অভ্যন্তরীণ বিরোধ মেটাতে কাজ করেছে।
ইরান-সৌদি আরব: ২০১৯ সালে সৌদি তেল স্থাপনায় হামলার পর যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা বাজছিল, তখন পাকিস্তান তেহরান ও রিয়াদের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে দূত হিসেবে কাজ করেছিল।
ইরাক-ইরান যুদ্ধ: আশির দশকে এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে গঠিত ওআইসির শান্তি কমিটিতে পাকিস্তান সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল।
৫. বর্তমান প্রেক্ষাপট: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা
পাকিস্তানের ইসলামাবাদে বর্তমানে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংলাপ দেশটির কূটনৈতিক পরিপক্বতার আরেকটি প্রমাণ।
কৌশলগত সুবিধা: পাকিস্তান একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা অংশীদার এবং ইরানের প্রতিবেশী রাষ্ট্র। এই দ্বিমুখী সম্পর্কই তাকে বর্তমান ‘অসম্ভব’ সংলাপটি আয়োজনে সহায়তা করেছে।
আলোচনার সুবিধার্থে প্রতিনিধিদের জন্য ভিসামুক্ত সুবিধা প্রদান এবং নজিরবিহীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে পাকিস্তান বিশ্বকে একটি স্থিতিশীল ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের বার্তা দিচ্ছে।
কেন পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সফল
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের সফলতার পেছনে তিনটি মূল কারণ রয়েছে:
ভৌগোলিক অবস্থান: আফগানিস্তান, ইরান, চীন ও ভারতের সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে প্রধান শক্তিগুলো পাকিস্তানকে এড়িয়ে চলতে পারে না।
সামরিক ও গোয়েন্দা সক্ষমতা: পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা (আইএসআই) অরাষ্ট্রীয় পক্ষগুলোর (যেমন তালেবান) ওপর প্রভাব বিস্তারে সক্ষম।
দীর্ঘস্থায়ী মৈত্রী: বেইজিংয়ের সঙ্গে ‘সদালাপী বন্ধু’ এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে ‘অপরিহার্য মিত্র’—এই দুই বিপরীতমুখী সম্পর্ক পাকিস্তান খুব সাবলীলভাবে পরিচালনা করে।
পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দেশটির প্রভাব কখনো ম্লান হয়নি। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের এই ভূমিকা কেবল তার নিজের নিরাপত্তার জন্যই নয়, বরং বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি অপরিহার্য উপাদান হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথ্যসূত্র: ডন নিউজ, রয়টার্স এবং কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (সিএফআর)