যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান গত ১৭ জুন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর আশাবাদের আবহ তৈরি হয়। উদ্দেশ্য ছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটানো এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি চূড়ান্ত চুক্তির লক্ষ্যে ৬০ দিনের আলোচনার সময়সীমা নির্ধারণ করা। তড়িঘড়ি প্রস্তুত করা ১৪ দফার এই নথিতে এমন কয়েকটি অস্পষ্ট ধারা রয়েছে, যেগুলোর ব্যাখ্যা ভিন্ন ভিন্নভাবে করা সম্ভব।
বিশেষ করে অনুচ্ছেদ ৫ নিয়ে মতবিরোধ, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সম্পর্কিত ছোটখাটো সংঘর্ষের জন্ম দিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত গত সপ্তাহের বড় ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণ হয়েছে। অনুচ্ছেদ ৫-এ বলা হয়েছে, ৬০ দিনের আলোচনার সময় ইরানকে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ‘নিরাপদ চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ নিতে হবে।
ইরান এই ধারার ব্যাখ্যা করেছে এমনভাবে যে, তারা জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার পেয়েছে, যার মধ্যে জাহাজগুলোকে কেবল ইরানের অনুমোদিত নিরাপদ রুট ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতাও অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাখ্যা হলো, এই ধারার অর্থ ইরানকে কোনো শর্ত ছাড়াই হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে পুনরায় উন্মুক্ত করতে হবে।
যখন যুক্তরাষ্ট্র জাহাজগুলোকে ওমান উপকূলঘেঁষা দক্ষিণাঞ্চলীয় করিডর ব্যবহার করতে নির্দেশ দিতে শুরু করে, তখন ইরান সতর্কবার্তা জারি করে এবং শেষ পর্যন্ত কয়েকটি জাহাজের ওপর গুলি চালায়। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে অনেকেই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের কাছ থেকে কৌশলে নিজেদের হাতে নেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। উভয় পক্ষই একে অপরকে সমঝোতা স্মারকের শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে।
সাম্প্রতিক এই উত্তেজনা প্রথমে সীমিত পর্যায়ে থাকবে বলে মনে হয়েছিল। মধ্যস্থতাকারীরা পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু এরপর সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র টানা পঞ্চম রাতের মতো ইরানে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উপসাগরে ইরানি জাহাজ চলাচলের ওপর আবারও অবরোধ আরোপ করেছেন।
ফলে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা এখন প্রায় নিশ্চিত।
হরমুজ প্রণালির প্রশ্নে ইরান খুব সহজে পিছু হটবে, এমন সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। ইরান সরকার বিশ্বাস করে, তারা সেখানে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ অর্জন করেছে, যা ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসন ঠেকাতে পারমাণবিক অস্ত্রের মতোই কার্যকর প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করতে পারে। ২০২৫ সালের জুন এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইসলামী প্রজাতন্ত্রের জন্য ডিটারেন্ট বা প্রতিরোধক্ষমতার গুরুত্ব যে কতটা বেড়েছে, তা অতিরঞ্জিত করে বলার সুযোগ নেই।
তবে প্রতিরোধক্ষমতাই একমাত্র লাভ নয়। হরমুজ প্রণালির ওপর কর্তৃত্ব এখন ইসলামী প্রজাতন্ত্রের কাছে জাতীয় গৌরবের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে, যেন এটি যুদ্ধজয়ের একটি অর্জন। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের জন্য বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা বয়ে আনতে পারে। ইরান সরকার বারবার বলেছে, আলোচনার সময়সীমা শেষ হলে তারা জাহাজ চলাচলের জন্য সেবা ফি আদায় শুরু করবে, যা তেহরানের জন্য বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারে।
আর এই সম্ভাব্য আয়ই এখন ওয়াশিংটন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইছে। ১৩ জুলাই ট্রাম্প ঘোষণা করেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ২০ শতাংশ হারে চার্জ আরোপ করবে। তিনি ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্রই হবে ‘হরমুজ প্রণালির অভিভাবক।’ জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা যে দেবে, তার পারিশ্রমিক পাওয়া উচিত। এরপর তিনি সেই ভূমিকাটি তেহরানের জন্য দাবি করেন। তিনি লেখেন, ‘ইরান সবসময়ই প্রণালির অভিভাবক ছিল এবং চিরকাল থাকবে। ২০ শতাংশ অবশ্যই খুব বেশি। আমরা ন্যায্য থাকব।’ পরে অবশ্য ট্রাম্প টোল আদায়ের ঘোষণা থেকে সরে আসেন।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ থেকে যে কৌশলগত, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যায়, তা বিবেচনায় নিলে, ২৮ ফেব্রুয়ারির আগের অবস্থায় স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে ইরান রাজি হবে, এমন সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। কিন্তু হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও উপসাগরীয় অঞ্চলে তাঁর মিত্রদের এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় অংশের কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এর ফলে একটি কৌশলগত অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যুদ্ধ থেকে অর্জিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা ছেড়ে দেওয়ার কোনো প্রণোদনা ইরানের নেই। অন্যদিকে, তেহরান এমন এক নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতা তৈরি করবে, যেখানে একটি আন্তর্জাতিক জলপথের ওপর তাদের নজিরবিহীন নিয়ন্ত্রণ থাকবে, সেটিও যুক্তরাষ্ট্র সহজে মেনে নিতে পারে না। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের জন্য এমন পরিস্থিতি মেনে নেওয়া কার্যত নিজেদের কৌশলগত ব্যর্থতা স্বীকার করার শামিল হবে।
এই যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল ইরানের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থের অনুকূল একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দেওয়া।
কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। ইসলামী প্রজাতন্ত্র টিকে গেছে, আঞ্চলিক প্রভাব আরও বিস্তৃত করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর উল্লেখযোগ্য ক্ষতি চাপিয়ে দেওয়ার সক্ষমতাও প্রদর্শন করেছে। যুদ্ধের এই ফলাফল ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের নেতাদের বিস্মিত করে থাকতে পারে, কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের কাছে এটি অপ্রত্যাশিত ছিল না।
যুদ্ধের আগেই বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করেছিলেন, ইরানের ওপর আরেকটি বড় ধরনের হামলা হলে উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্যাপক পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। তবু মনে হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই সম্ভাবনাটি যথাযথভাবে উপলব্ধি না করেই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। যুদ্ধ শুরুর প্রায় দুই সপ্তাহ পর, মার্চের মাঝামাঝি ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘কেউ আশা করেনি যে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলা চালাবে...আমরা বিস্মিত হয়েছিলাম।’
যুদ্ধের আগে বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেছিলেন যে, ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলও হুমকির মুখে ফেলতে পারে। কিন্তু এই সম্ভাবনাতেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয়ই অপ্রস্তুত অবস্থায় ধরা পড়েছে বলে মনে হয়। মার্চে ট্রাম্পের প্রকাশ করা এই ‘বিস্ময়’ আসলে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বৃহত্তর কৌশলগত ভুল হিসাবকেই স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের রাজনৈতিক আলোচনায় জোর দিয়ে বলা হয়েছে, ইরানের সরকার দেশীয়ভাবে অত্যন্ত অজনপ্রিয় এবং দুর্বল। ওয়াশিংটন ও তেল আবিব উভয়ই ধরে নিয়েছিল, ইসলামি প্রজাতন্ত্র যেন পতনের একেবারে দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে এবং যথেষ্ট মাত্রার বাহ্যিক চাপ সৃষ্টি করা গেলে ইরানের জনগণ গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকারকে উৎখাত করবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে ইরানে বিক্ষোভ উসকে দিতে সহায়তা করেছিল এবং সহিংস ইরানি বিদ্রোহীদের অস্ত্রও সরবরাহ করেছিল। কিন্তু যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন সম্পর্কে যে ধারণা প্রচার করা হয়েছিল, তা সবসময়ই অতিরঞ্জিত ছিল।
এটি সত্য যে, লাখ লাখ ইরানি তাঁদের সরকারের বিরোধিতা করেন। তবে এটিও সমান সত্য যে, লাখ লাখ ইরানি সরকারকে সমর্থনও করেন। ইরানি রাষ্ট্র কয়েক দিনের মধ্যেই বিক্ষোভ দমন করতে সক্ষম হয়েছিল। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটারদের প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ আনুমানিক ৩ কোটি মানুষ, সাঈদ জালিলি অথবা মাসউদ পেজেশকিয়ানের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। তাঁরা দুজনই দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও সংবিধানের প্রতি অনুগত।
ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নানা জটিল বিষয়ে নির্ভর করে। তাই নির্বাচনের এই ফলাফল থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে, ইরানের অর্ধেক ভোটার বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে সমর্থন করেন। তবে এই পরিসংখ্যান অন্তত এটুকু ইঙ্গিত দেয় যে, ওয়াশিংটন ও তেল আবিব যতটা মনে করে, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি ইরানি এই ব্যবস্থার প্রতি সমর্থনশীল।
যুদ্ধের ফলে সম্ভবত ‘র্যালি-অ্যারাউন্ড-দ্য-ফ্ল্যাগ’ প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে এবং ইসলামি শাসনব্যবস্থা আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। গত সপ্তাহে এরই একটি বিশাল সংহতির প্রদর্শন দেখা যায়, যখন লাখ লাখ ইরানি টানা এক সপ্তাহ ধরে অনুষ্ঠিত শোকযাত্রায় অংশ নেন। এই শোকযাত্রা ছিল সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির জন্য, যিনি ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এক হামলায় নিহত হন।
ইরান সরকারের নতুন করে অর্জিত প্রভাব ও শক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক অবস্থায় ফেলেছে, যেখানে সামনে রয়েছে শুধু খারাপ এবং আরও খারাপ বিকল্প। হরমুজ প্রণালির সংকটের কোনো সহজ সামরিক সমাধান নেই। সেখানে নৌপথে বিঘ্ন ঘটাতে ইরানের প্রচলিত অর্থে নৌবাহিনীর শ্রেষ্ঠত্বের প্রয়োজন নেই। ছোট আকারের দ্রুতগতির নৌকা, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং সামুদ্রিক মাইনই বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য যথেষ্ট হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।
একইভাবে, সরকার পরিবর্তনের কৌশলও বাস্তবসম্মত নয়। ইরানের সরকার উৎখাত করতে যে ধরনের স্থলবাহিনী মোতায়েন প্রায় নিশ্চিতভাবেই প্রয়োজন হবে, সেই ধরনের বাহিনী পাঠানোর কোনো আগ্রহ যুক্তরাষ্ট্র দেখায়নি।
তার ওপর, স্থলবাহিনী নিয়ে বড় ধরনের সামরিক অভিযান হবে ব্যয়বহুল, অনিশ্চিত এবং মার্কিন জনগণের কাছে অজনপ্রিয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নভেম্বরের মধ্যবর্তী (মিডটার্ম) নির্বাচন সামনে রেখে এমন অভিযান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর রিপাবলিকান মিত্রদের জন্য রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর হবে।
ট্রাম্প প্রশাসন, বারবার জানিয়েছে যে তারা সর্বাত্মক যুদ্ধে ফিরতে চায় না। তারা সম্ভবত এসব বাস্তবতাই উপলব্ধি করছে। ফলে ওয়াশিংটন এখন কঠিন অবস্থায় রয়েছে। তারা যেমন হরমুজ প্রণালিতে গড়ে ওঠা নতুন বাস্তবতাকে মেনে নিতে চায় না, তেমনি সেই বাস্তবতা পাল্টাতে যে বিপুল মূল্য দিতে হবে, সেটিও দিতে প্রস্তুত নয়।
সমঝোতা স্মারকের বাকি অংশও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রায় সমানভাবে সমস্যাজনক। চুক্তির বেশ কয়েকটি ধারা ইরানের পক্ষে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে বড় পরিসরে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং অর্থনৈতিক স্বাভাবিকীকরণের প্রতিশ্রুতি। অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের চাওয়া বেশ কিছু বিষয় চুক্তিতে অন্তর্ভুক্তই করা হয়নি। সমঝোতা স্মারকে ইরানের মিত্রদের নেটওয়ার্ক, যেমন লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি, ইরাকের হাশদ আল-শাবি এবং ফিলিস্তিনি হামাসের কোনো উল্লেখ নেই। এই অনুপস্থিতি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তথাকথিত ‘প্রক্সি নেটওয়ার্ক’-এর পতন ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
এ ছাড়া, সমঝোতা স্মারকে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিরও কোনো উল্লেখ নেই। এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাদ পড়া বিষয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ‘ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করবে এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র শিল্পকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেবে। সবকিছু আবারও সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।’
কিন্তু জুন মাসে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করার সময় ট্রাম্প সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান নেন। তিনি বলেন, যেহেতু ইরানের শত্রুদের কাছেও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, তাই ইরানকে সেগুলো রাখতে না দেওয়া ‘অন্যায্য’ হবে। ট্রাম্পের এই অবস্থান পরিবর্তন ইঙ্গিত দেয় যে, তিনি নীরবে এমন এক নতুন বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছেন, যেখানে ইরান আঞ্চলিক পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য ক্ষমতার অধিকারী।
ট্রাম্প প্রশাসন এখনো আশাবাদী যে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত কোনো চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অনুকূল ফল বয়ে আনবে। কিন্তু এমন ফলাফল অর্জনের সম্ভাবনা খুবই কম। প্রধান কারণ, যুদ্ধ জয় করেছে বলে বিশ্বাস করা একটি ইরান আলোচনায় প্রায় নিশ্চিতভাবেই সর্বোচ্চ দাবি-দাওয়াভিত্তিক অবস্থান বজায় রাখবে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তেহরান আবারও ঘোষণা করেছে যে, আন্তর্জাতিক আইন এবং পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) অনুযায়ী শান্তিপূর্ণ বেসামরিক উদ্দেশ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার তাদের সংরক্ষিত রয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র এখনো জোর দিয়ে বলছে, ইরানকে ‘শূন্য-সমৃদ্ধকরণ’ (জিরো এনরিচমেন্ট) নীতি গ্রহণ করতে হবে।
১৮ জুন, অর্থাৎ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের এক দিন পর, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, ‘ওবামার পারমাণবিক চুক্তি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দিয়েছিল। আমাদের চুক্তি তা দেবে না।’ সমঝোতা স্মারকটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের প্রশ্নের কোনো সমাধান দেয়নি। সেখানে শুধু বলা হয়েছে, আলোচনার সময় দুই পক্ষ ‘ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবে।’
কিন্তু কেবল আলোচনা করলেই এই বিরোধ, কিংবা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ইরানের মজুতসংক্রান্ত অন্যান্য বিরোধ, দূর হয়ে যাবে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। এ কারণেই চলতি সপ্তাহের উত্তেজনা সম্ভবত শেষ উত্তেজনা নয়। নতুন স্থিতাবস্থা হয়তো দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার একটি সময়ের সূচনা।
ট্রাম্প দ্রুত বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ৯ মার্চ তিনি এই যুদ্ধকে ‘একটি ছোট্ট অভিযান’ বলে উল্লেখ করেছিলেন এবং বলেছিলেন, এটি ‘খুব শিগগিরই’ শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু সংক্ষিপ্ত সামরিক অভিযানের পরিবর্তে এই সংঘাত ক্রমেই দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত মোকাবিলার সূচনায় পরিণত হচ্ছে, যা সম্ভবত পর্যায়ক্রমিক সংকট, আলোচনা এবং সামরিক পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলবে।
উভয় পক্ষই এমন একটি নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে থাকবে, যা ২৮ ফেব্রুয়ারির আগের বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাষ্ট্রগুলো এমন এক ইরানের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে শুরু করবে, যে ইরান আগের চেয়ে বেশি আত্মবিশ্বাসী, সাহসী এবং দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। এর ফলে নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব এবং রাজনৈতিক জোট গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও প্রবল।
অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান