হোম > বিশ্লেষণ

‘মমতা’ময়ী দিদির তৃণমূল কংগ্রেস কেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

মমতা ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত

পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গত ২৪ মে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ‘বাংলায় (পশ্চিমবঙ্গে) যদি আপনারা আমাদের যত বেশি নির্যাতন করবেন, দিল্লিতে তত বেশি সমস্যার মুখে পড়বেন।’ এটি ছিল নির্বাচনের পর তাঁর প্রথম প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া। তিনি যখন এই হুঁশিয়ারি দিচ্ছিলেন, তখন তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির কাছে পরাজিত হওয়ার পর নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় দলের কর্মীরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল।

কিন্তু মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। মমতার হুমকি উল্টো হয়ে গেছে। দিল্লিতে বিজেপি নয়, খোদ মমতার দলই সমস্যায় পড়ে গেছে। পরিস্থিতি এমন যে এখন পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি দিল্লিতেও তৃণমূল কংগ্রেস গভীর রাজনৈতিক সংকটে পড়েছে। গত সপ্তাহে দলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবস্থান অমান্য করে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় নিজেরাই বিরোধী দলনেতা নির্বাচন করেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সংখ্যা ৫৮ জন পর্যন্ত পৌঁছায়। একই সঙ্গে সোমবার লোকসভাতেও তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্যরা কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন।

দলের প্রবীণ নেতা কাকল ঘোষ দস্তিদার দিল্লিতে সাংবাদিকদের জানান, তৃণমূলের ২৮ জন লোকসভা সংসদ সদস্যদের মধ্যে অন্তত ২০ জনই বিজেপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটের (এনডিএ) সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাজ্যের ‘উন্নয়ন’ নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে বিজেপির কড়া বিরোধী শক্তি হিসেবে পরিচিত তৃণমূল কংগ্রেস ছিল বিরোধী দলগুলোর জোট ‘ইন্ডিয়া’র অন্যতম বৃহৎ শরিক।

এই বিদ্রোহী অংশের প্রধান মুখগুলো সরাসরি দলের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে লক্ষ্য করে আক্রমণ করছে। অভিষেক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাতিজা। তাঁদের অভিযোগ, তিনি দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ধ্বংস করেছেন এবং ব্যাপক দুর্নীতির মাধ্যমে দলকে অজনপ্রিয় করে তুলেছেন। অন্যদিকে দলের আরেক অংশ দাবি করছে, বিজেপি পরিকল্পিতভাবে দল ভাঙার চেষ্টা করছে এবং তদন্তকারী সংস্থাগুলো ব্যবহার করে অসন্তুষ্ট নেতাদের ভয় দেখিয়ে দলত্যাগে বাধ্য করছে।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, এই দুই ব্যাখ্যার বাইরেও একটি বড় বাস্তবতা রয়েছে—তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক কাঠামোর দীর্ঘদিনের দুর্বলতা, যা এখন প্রকাশ্যে ভেঙে পড়ছে।

গত ৪ মে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই তৃণমূলের একাধিক নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজয়ের জন্য দায়ী করতে শুরু করেন। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন দলকে টিকিয়ে রাখা অভিজ্ঞ নেতাদের তিনি উপেক্ষা করেছেন এবং রাজনৈতিক পরামর্শক সংস্থা ‘ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি–আইপ্যাক’ ব্যবহার করে দল নিয়ন্ত্রণ করেছেন। সমালোচনার ভাষা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে তা আগে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়া নেতাদের বক্তব্যের সঙ্গে প্রায় একাকার হয়ে যায়। এর ফলে নতুন করে বড় ধরনের ভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হয়। সেই আশঙ্কা আরও তীব্র হয় পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে ঘিরে বিতর্কে।

আইনগতভাবে তৃণমূলের বিরোধী দলনেতা বেছে নেওয়ার অধিকার থাকলেও, দলের প্রস্তাবিত প্রবীণ নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম বিজেপি নিযুক্ত স্পিকার অনুমোদন করেননি। এরপর দুই বিধায়ক দাবি করেন, তাঁরা চট্টোপাধ্যায়ের নাম প্রস্তাবের চিঠিতে স্বাক্ষরই করেননি। এই অভিযোগের ভিত্তিতে বিজেপি-শাসিত রাজ্য পুলিশ জালিয়াতির তদন্ত শুরু করে। এমনকি ৩ জুন পশ্চিমবঙ্গ ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট এই মামলার সূত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনে অভিযান চালায়।

পরে একই দিনে দুই বিধায়ক আরও কয়েকজন তৃণমূল বিধায়ককে নিয়ে বৈঠক করেন এবং সিদ্ধান্ত হয় যে তাঁদের একজন, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী দলনেতা হবেন। বিধানসভার স্পিকার দ্রুত সেই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন। তবে দলটি এই নিয়োগের বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করেছে।

আয়রনি হলো, এই বৈঠকে কিছু বিধায়ক প্রকাশ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁদের নেতা হিসেবে ঘোষণা করেন। তাঁদের দাবি, বিদ্রোহ মূলত তাঁর ভাতিজা তথা দলের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধেই।

এ ঘটনাকে অনেকেই মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করছেন। বছর খানেক আগে, একনাথ সিন্ধে শিবসেনার উত্তরাধিকারী মুখমন্ত্রী উদ্ধভ ঠাকরের পুত্র আদিত্য ঠাকরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে দল ভাঙেন এবং পরে বিজেপিতেই যোগ দেন। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও শুভেন্দু অধিকারীর ২০২০ সালের দলত্যাগকে ঘিরে একই ধরনের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে, যিনি একসময় বিজেপির সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী মুখ হিসেবে বিবেচিত ছিলেন এবং পরে মুখ্যমন্ত্রীও হন। তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাতিজাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিরোধিতায় দল ছাড়েন।

অপারেশন লোটাস ও বিজেপির ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক

তৃণমূলের যাঁরা এই বিদ্রোহে যুক্ত হননি, তাঁরা পারিবারিক নেতৃত্বের তত্ত্বকে অস্বীকার করে এর পেছনে বিজেপির চাপ প্রয়োগের অভিযোগ তুলছেন। সংসদ সদস্য কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘এই একই লোকেরা অভিষেককে ক্রাউন প্রিন্স বানিয়েছিল এবং তাঁকে নিজেদের কমান্ডার-ইন-চিফ বলত। তাহলে এখন কী বদলাল? আমরা আর ক্ষমতায় নেই—এটাই কি কারণ?’

তিনি দাবি করেন, বিজেপির সঙ্গে যুক্ত তৃণমূল সাংসদরা সোমবার দিল্লিতে কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী ভূপেন্দর যাদবের বাসভবনে বৈঠক করেছেন এবং সেখানে শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতির কথাও শোনা গেছে। তাঁর মতে, এটি প্রমাণ করে বিজেপিই এই বিভাজনের নেপথ্যে এবং অংশগ্রহণকারীরা লোভ বা ভয়ের কারণে এতে জড়িত। তিনি আরও বলেন, ‘ওরা এতটাই অভ্যস্ত মুখ্যমন্ত্রীর পাশে দাঁড়াতে যে এখনো সেটাই করে যাচ্ছে। তারা বিরোধীর ভূমিকা নিতে চায় না। এখন তাদের বলা হবে বাকি আমাদের জেলে ঢোকাতে সাহায্য করতে।’ তিনি বিজেপি শাসনকালে তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে হওয়া একাধিক গ্রেপ্তারের দিকেও ইঙ্গিত করেন।

সাংগঠনিক দুর্বলতা ও নতুন নেতৃত্বের বিতর্ক

কিছু ক্ষেত্রে বিজেপি সরাসরি চাপ না দিয়েও তৃণমূল সংসদ সদস্যদের নিজেদের দিকে টানতে সক্ষম হয়েছে। যেমন সাবেক ক্রিকেটার ইউসুফ পাঠান। তিনি বিদ্রোহী গোষ্ঠীতে যোগ দিয়েছেন এবং বিষয়টি নিয়ে দলে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। মমতার ঘনিষ্ঠ নেত্রী ও সাংসদ মহুয়া মৈত্র পাঠানকে উদ্দেশ্য করে এক্সে লিখেন, ‘অমিত শাহ কি তোমাকে ডেকেছেন বলে তুমি দিল্লিতে ছুটে যাচ্ছ? লজ্জা আর কিছুটা আত্মসম্মান রাখো।’

পাঠান গুজরাটে জন্মগ্রহণ করলেও ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুর আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য হন। তিনি সেখানে পাঁচবারের সংসদ সদস্য এবং লোকসভার প্রাক্তন বিরোধী দলনেতা কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরীকে পরাজিত করেন। গত বছর তাঁর নির্বাচনী এলাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হলেও তিনি সেখানে না যাওয়ার জন্য সমালোচিত হন।

পাঠান একা নন। দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে তারা তুলনামূলকভাবে অনভিজ্ঞ বা দুর্বল প্রার্থীদের সংসদে পাঠিয়েছে। এমনকি নির্বাচনে পরাজয়ের আগেই দলটি নিজেদের সংগঠনের বদলে রাজনৈতিক পরামর্শদাতা সংস্থা আই-প্যাক-এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করছিল—এমন সমালোচনাও ছিল।

পরাজয়ের পর কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়সহ একাধিক অনুগত নেতা প্রকাশ্যে আইপ্যাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার সমালোচনা করেছেন। এসব মিলিয়ে স্পষ্ট হয়, তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক কাঠামো গভীর সংকটে। আর সেই দুর্বলতাই ক্ষমতা হারানোর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দলটিকে দ্রুত বিভাজন ও ভাঙনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে—যেখানে রাজনৈতিক সংঘাত শুধু ক্ষমতার নয়, অস্তিত্বেরও প্রশ্ন হয়ে উঠছে।

দ্য স্ক্রল থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

জোরপূর্বক সেনা ভর্তি বাড়িয়েছে মিয়ানমার জান্তা, জায়গা হারাচ্ছে বিদ্রোহীরা

ভারতের অন্যতম সফল নারী রাজনীতিক থেকে দল হারানোর পথে মমতা

‘নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্রের’ বিরুদ্ধে ককরোচদের আন্দোলন কোন পথে, কী ভাবছে মোদি সরকার

‘গোদি মিডিয়া’ থেকে বিচারব্যবস্থা—দিল্লিতে কিসের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ‘ককরোচ’দের

ভারত কি চাইলেই কাউকে বাংলাদেশে পুশ ইন করতে পারে

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চাপানো যুদ্ধের কারণেই আঞ্চলিক পরাশক্তি হয়ে উঠেছে ইরান?

যুদ্ধবিরতি থাকলেও কেন হামলা চলছে গাজা-লেবানন ও ইরানে

ট্রাম্পের যুদ্ধক্ষমতা কমানো: প্রতিনিধি পরিষদের ভোটের প্রভাব কী

হরমুজে অচলাবস্থা থেকে নতুন এক ‘অস্ত্র’ পেয়েছে ইরান

অংশীদার থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী: দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাব খর্ব করছে যুক্তরাষ্ট্র?