ইরান যুদ্ধের দ্বিতীয় মাসে এসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘যুদ্ধবিরতি চুক্তি’ নিয়ে চরম সংশয় দেখা দিয়েছে। কেননা যেসব লক্ষ্য নিয়ে আমেরিকা ও ইসরায়েল এই ব্যয়বহুল ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ শুরু করেছিল, তার সামান্যতম উদ্দেশ্যও হাসিল হয়নি। উল্টো এই চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগেই অকালমৃত্যুর দিকে এগোচ্ছে। মার্কিন স্পেশাল অপারেশন ফোর্সের সাবেক উপদেষ্টা ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ সেথ জোনস এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, এই যুদ্ধবিরতি কোনো পক্ষই দীর্ঘ মেয়াদে মেনে নেবে না। কারণ, যুদ্ধের কোনো লক্ষ্যই এখন পর্যন্ত অর্জিত হয়নি।
সিএনএন নিউজ-১৮কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেথ জোনস বলেছেন, মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি জানতে পেরেছেন, এই যুদ্ধবিরতি কোনো পক্ষই আন্তরিকভাবে মেনে নিচ্ছে না। বিশেষ করে ইসরায়েল এই চুক্তিতে মোটেই স্বস্তিবোধ করছে না। যুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা এবং তাদের আঞ্চলিক ছায়াসেনা বা প্রক্সি বাহিনীগুলোকে নিষ্ক্রিয় করা। কিন্তু বর্তমান চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। এখনো ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল ভান্ডারের উল্লেখযোগ্য অংশ অক্ষত রয়েছে এবং মিত্র হুতি ও হিজবুল্লাহর হামলা থামার কোনো লক্ষণ নেই।
এই পরিস্থিতিকে আমলে নিয়ে জোনস বলেন, যখন কোনো পক্ষই তাদের ন্যূনতম লক্ষ্য অর্জন করতে পারে না, তখন সেই যুদ্ধবিরতি আসলে শুধু একটি ‘টাইম-আউট’ হিসেবে কাজ করে, যা পরে বড় সংঘাতের রসদ জোগায়।
হরমুজ প্রণালির চাবি কার
এই যুদ্ধবিরতি আলোচনার সবচেয়ে বিতর্কিত এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘হরমুজ প্রণালি’। এই প্রণালি বর্তমান যুদ্ধের প্রধান অর্থনৈতিক অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান যখন এটি বন্ধ করে দেয়, তখন বিশ্ব অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে। অদ্ভুতভাবে ট্রাম্পের এই যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের পর ইরান এবং হোয়াইট হাউস উভয়ের বক্তব্য থেকে একটি চরম তেতো সত্য বেরিয়ে এসেছে, তা হলো বর্তমানে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কার্যত ইরানের হাতে।
ইরানি সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এক বিবৃতিতে সাফ জানিয়ে দিয়েছে, প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করবে তাদের সশস্ত্র বাহিনী। সেথ জোনস বিষয়টিকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিচার করে বলেছেন, ‘এটি একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক ঘটনা। অতীতে কখনোই আন্তর্জাতিক এই জলপথের ওপর ইরানের এমন একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়া হয়নি।’ যদি এই চুক্তির অধীনে ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পায়, তবে প্রতিটি জাহাজ থেকে টোল আদায়ের মাধ্যমে তারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করবে। সেই অর্থ তারা পুনরায় তাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত সামরিক অবকাঠামো, মিসাইল প্রোগ্রাম এবং ড্রোন প্রযুক্তি পুনর্গঠনে ব্যয় করবে। ফলে আমেরিকা ও ইসরায়েলের এত দিনের সামরিক অভিযান কার্যত পণ্ডশ্রমে পরিণত হবে।
রাশিয়া ও চীনের মদদ
ইরানের এই অনমনীয় অবস্থানের পেছনে প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করছে রাশিয়া ও বেইজিংয়ের সরাসরি সমর্থন। আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপে হরমুজ প্রণালি মুক্ত করতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আমেরিকা-সমর্থিত একটি প্রস্তাবে রাশিয়া ও চীন ‘ভেটো’ দিয়েছে। এটি শুধু কূটনৈতিক সমর্থন নয়, বরং এর পেছনে গভীর সামরিক স্বার্থ কাজ করছে।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, চীন অত্যন্ত গোপনে জাহাজে করে ইরানের মিসাইল প্রোগ্রামের জন্য প্রয়োজনীয় ইলেকট্রনিক পার্টস ও যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে যাচ্ছে। অন্যদিকে রাশিয়া ইরানকে এই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক স্থাপনাগুলোর বিস্তারিত ‘ম্যাপিং’ এবং হাই-রেজল্যুশনের ছবি দিচ্ছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে ইরান দিয়েগো গার্সিয়ার মতো দূরবর্তী মার্কিন ঘাঁটিতে নির্ভুলভাবে হামলা চালাতে সক্ষম হয়েছে। এই দুই পরাশক্তির সমর্থনে আলোচনার টেবিলে কঠোর হচ্ছে ইরান, আর ব্যর্থ হচ্ছে ট্রাম্পের জবরদস্তিমূলক নীতি।
যুদ্ধবিরতির বদলে ইরান যেসব শর্ত জুড়ে দিয়েছে, তা ওয়াশিংটনের জন্য সম্মানহানিকর। তারা কেবল যুদ্ধ বন্ধ নয়, বরং মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের সব মার্কিন ঘাঁটি থেকে যুদ্ধকালীন বাহিনী প্রত্যাহারের দাবিও তুলে ধরা হয়েছে। এর পাশাপাশি অতিসমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম (এইচইইউ) নিয়ে ইরানের রহস্যজনক নীরবতা পশ্চিমা দেশগুলোকে আরও আতঙ্কিত করে তুলেছে।
আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো একটি ‘শান্তিচুক্তি’র তকমা দিয়ে নির্বাচনী বৈতরণি পার হতে চাইছেন, কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বলছে, এই চুক্তি কোনো পক্ষের জন্যই শান্তি আনবে না; বরং এটি ইরানকে পুনরায় শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ করে দেবে।
সেথ জোনসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কোনো লক্ষ্য পূরণ না হওয়া সত্ত্বেও তড়িঘড়ি করে যুদ্ধবিরতি ডাকার অর্থ হলো, আমেরিকার রণকৌশলের পরাজয়। ইরান এখন তার ভৌগোলিক অবস্থান এবং রাশিয়া-চীনের অক্ষকে ব্যবহার করে নিজেকে এক অপরাজেয় শক্তি হিসেবে জাহির করছে। ট্রাম্পের এই চুক্তি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হওয়ার চেয়ে বরং একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের পূর্বাভাস হিসেবেই দেখা দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজার এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে ইরানের আধিপত্য কমার চেয়ে বরং আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কাই প্রবল।