হোম > বিশ্লেষণ

যে পাঁচ উপায়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি বদলে দিয়েছেন ট্রাম্প

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ছবি: বিবিসি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে অভিবাসন নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছেন। সীমান্ত বন্ধ করা, অবৈধ অভিবাসীদের গণহারে বহিষ্কার, সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ এবং শরণার্থী ও বিদেশি কর্মীদের প্রবেশ সীমিত করার মতো পদক্ষেপ তাঁর প্রশাসনের নীতির কেন্দ্রে রয়েছে। এসব পদক্ষেপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে অভিবাসীদের প্রবেশ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে অভিযান পরিচালনার কৌশল ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের মাত্রা নিয়ে দেশটির জনগণের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে।

২০১৫ সালে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দেওয়ার সময় থেকেই অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন ট্রাম্প। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারেও সীমান্ত বন্ধ ও ইতিহাসের বৃহত্তম বহিষ্কার অভিযান পরিচালনার অঙ্গীকার করেন তিনি। তাঁর অভিবাসন নীতির পাঁচটি প্রধান দিক তুলে ধরেছে বিবিসি।

প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে দক্ষিণ সীমান্ত

জো বাইডেনের আমলে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্তে অভিবাসীদের সঙ্গে সীমান্তরক্ষীদের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা ৪৫ লাখ ছাড়িয়ে যায়। পরে আশ্রয়ের আবেদন সীমিত করে এবং অবৈধভাবে প্রবেশকারীদের দ্রুত সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে বাইডেন প্রশাসনও এই সংখ্যা কমানোর উদ্যোগ নেয়।

তবে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর সীমান্তে অভিবাসীদের প্রবেশ আরও কমে আসে। আশ্রয়ের আবেদন কার্যত স্থগিত রাখা, আটক ব্যক্তিদের ছেড়ে দেওয়ার নীতি বন্ধ করার পাশাপাশি সীমান্তে সেনা মোতায়েন এবং মেক্সিকোকে অভিবাসীদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে চাপ দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেয় তাঁর প্রশাসন।

২০২৫ সালের নভেম্বরে টেক্সাসের সীমান্ত শহর এল পাসো পরিদর্শন করে বিবিসি জানায়, শহরটি আগে যেখানে হাজারো অভিবাসীর অস্থায়ী শিবির ছিল, এখন সেখানে পরিস্থিতি অনেকটাই শান্ত হয়ে এসেছে।

দ্রুত এগোচ্ছে সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ

যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে প্রায় ৩ হাজার ২১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ দেয়াল নির্মাণ ট্রাম্পের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে এই প্রকল্পের কাজ আরও গতি পেয়েছে। এই প্রকল্পের জন্য তাঁর প্রশাসনের ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল’ ব্যয় পরিকল্পনা থেকে ৪ হাজার ৬৫০ কোটি ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার আগে সীমান্তের কাছাকাছি প্রায় ৬৪৪ মাইল প্রধান দেয়াল এবং আরও ভেতরে ৭৫ মাইল দ্বিতীয় স্তরের দেয়াল ছিল। এরপর নতুন করে প্রায় ২৫০ মাইল দেয়াল ও অন্যান্য প্রতিবন্ধক নির্মাণ করা হয়েছে। আরও ১ হাজার ৪৪৩ মাইল প্রতিবন্ধক নির্মাণাধীন।

তবে দেয়াল নির্মাণে অভিবাসীদের প্রবেশ কতটা কমেছে, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। আমেরিকান ইমিগ্রেশন কাউন্সিলের অভিবাসনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অ্যারন রাইখলিন-মেলনিকের মতে, সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের কারণে অভিবাসী প্রবেশে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের প্রমাণ নেই। তাঁর মতে, প্রবেশ কমার পেছনে ট্রাম্পের নীতি ও কঠোর বার্তার ভূমিকাই বেশি।

আটক ও বহিষ্কারের সংখ্যা বেড়েছে

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা (আইসিই) পরিচালিত অভিযান ট্রাম্পের নীতির সবচেয়ে আলোচিত অংশ। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে এক মাসে প্রায় ৫০ হাজার অভিবাসীকে গ্রেপ্তারের রেকর্ড পাওয়া যায় বলে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলে ও ইউসিএলএর গবেষকদের পরিচালিত ডিপোর্টেশন ডেটা প্রজেক্টের তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বড় অংশের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রেকর্ড ছিল না। ওই বছরের জুলাইয়ে আটক অভিবাসীদের মধ্যে অপরাধের ইতিহাস থাকা ব্যক্তির হার ছিল ২৭ শতাংশ।

জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে আইসিই প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ২৫৫ জনকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করছিল। বাইডেনের মেয়াদের শেষ মাসগুলোতে এই সংখ্যা ছিল দৈনিক প্রায় ৭৭০ জন।

তবে মিনিয়াপোলিসে ২০২৬ সালের শুরুর দিকে পরিচালিত ‘অপারেশন মেট্রো সার্জ’ অভিযানে দুই মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার পর অভিবাসন অভিযান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। ২১ অক্টোবর প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা কলেজের এক জরিপে ৫০ শতাংশ ভোটার অভিবাসন ইস্যুতে ডেমোক্র্যাটদের ওপর আস্থা প্রকাশ করেন; রিপাবলিকানদের ওপর আস্থা জানান ৪৬ শতাংশ।

শরণার্থী গ্রহণ ও মানবিক সুরক্ষা সীমিত

দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্প শরণার্থী গ্রহণ কার্যক্রম স্থগিত করেন। পরে দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ আফ্রিকানদের জন্য সীমিতভাবে এই কার্যক্রম চালু করা হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার অবশ্য দেশটিতে তাঁদের ওপর নিপীড়নের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

২০২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে শরণার্থী গ্রহণের প্রাথমিক সীমা ছিল ৭ হাজার ৫০০, যা পরে বাড়িয়ে ১৭ হাজার ৫০০ করা হয়। তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে ১৬ হাজার ২৯২ জন শরণার্থী যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন। তাঁদের মধ্যে ১৬ হাজার ২৮৭ জনই ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিক।

অন্যদিকে, বাইডেন প্রশাসনের শেষ দুই অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে যথাক্রমে প্রায় ৬০ হাজার ও এক লাখ শরণার্থী প্রবেশ করেছিলেন। তবে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের জন্য চালু থাকা অস্থায়ী সুরক্ষিত মর্যাদা (টিপিএস) বাতিলের উদ্যোগ নেন। এতে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার হাইতীয়সহ বিভিন্ন দেশের কয়েক লাখ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস ও কাজের আইনি সুরক্ষা হারিয়ে বহিষ্কারের ঝুঁকিতে পড়েন।

ভিসায় কড়াকড়ি, ধনীদের জন্য ‘গোল্ড কার্ড’

ট্রাম্পের মেয়াদে বিদেশি কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পথও কঠোর করা হয়েছে। নিরাপত্তাঝুঁকির কারণ দেখিয়ে কয়েক ডজন দেশের নাগরিকদের ওপর পূর্ণ বা আংশিক ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। দক্ষ বিদেশি কর্মীদের জন্য ‘এইচ-১ বি’ ভিসার নতুন আবেদনে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এক লাখ ডলার ফি আরোপের ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে বিশেষ করে ভারতীয় কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল প্রযুক্তি খাতে উদ্বেগ দেখা দেয়। ২০২৭ সালের জন্য নিবন্ধন ৪০ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছে মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন পরিষেবা সংস্থা।

আদালত আপাতত এক লাখ ডলারের ফি আটকে দিলেও এর প্রভাব নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। হোয়ার্টন স্কুলের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, এইচ-১বি নীতির পরিবর্তনে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া কর্মীদের মজুরিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নেই।

অন্যদিকে, ধনী বিদেশিদের আকৃষ্ট করতে ২০২৫ সালে চালু করা হয় ‘ট্রাম্প গোল্ড কার্ড’ কর্মসূচি। এতে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের সুযোগ পেতে সরকারি তহবিলে ১০ লাখ ডলার অনুদান এবং ফেরতযোগ্য নয় এমন ১৫ হাজার ডলার আবেদন ফি দিতে হয়। তবে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এ কর্মসূচিতে মাত্র একজন আবেদনকারী অনুমোদন পেয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও বহিষ্কার অভিযান জোরদার করার পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসন বৈধ অভিবাসনের পথও সংকুচিত করেছে। তবে এসব পদক্ষেপের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে দেয়াল নির্মাণের কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।

প্রথম দফায় হেরেও দ্বিতীয় দফায় কীভাবে জিতলেন ব্রাজিলের লুলা

মার্কিন নির্বাচনের পর ইরানে হামলার কৌশলও কেন কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না

ইউক্রেনকে পঙ্গু করতে রাশিয়ার ‘হিট লিস্টে’ যেসব স্থাপনা

মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ: এর মানে কী

১০ দিনে ৪ মহাদেশে ৪ নির্বাচন, বড় পরীক্ষার মুখে গণতন্ত্র

ইতিহাস গড়ার দ্বারপ্রান্তে জাতিসংঘ: প্রথম নারী মহাসচিবের সম্ভাবনা, প্রার্থী যাঁরা

দেশে দেশে কেন বিদ্রোহ করছে জেন-জি

নিরাপত্তা-সমৃদ্ধি ও সংস্কার: তিন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষায় সৌদি যুবরাজ

ভারতে ব্যবসা ও বিনিয়োগে জ্যোতিষশাস্ত্রের বাজার এখন ৭০ হাজার কোটি টাকা, কীভাবে হলো

নির্বাচনে এবার নেতানিয়াহুর ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াই সহজ নাকি কঠিন