হোম > বিশ্লেষণ

নিজ ভূমে পরবাসী: ইসরায়েলে ফিলিস্তিনি আরব কারা, ক্ষমতা-রাজনীতি ও অধিকার আদায়ে তাদের সংগ্রাম

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৪৮ সালের নাকবার স্মৃতি স্মরণে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করছেন এক আরব ফিলিস্তিনি নারী। ছবি: এএফপি

নিজ মাতৃভূমিতেই সংখ্যালঘু হিসেবে বসবাস করছেন ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা। কয়েক দশক ধরে তাঁরা বৈষম্য, প্রান্তিকীকরণ ও সহিংসতার শিকার হয়ে আসছেন। তাঁরা সেই ফিলিস্তিনিদের বংশধর, যাঁরা ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর সংঘটিত নাকবা বা মহাবিপর্যয়ের মধ্যেও বেঁচে গিয়েছিলেন এবং ইসরায়েলের কার্যত নির্ধারিত সীমানার ভেতরে থেকে গিয়েছিলেন। বর্তমানে তাঁদের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ। ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তাঁরা।

ইসরায়েলের নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও তাঁরা বৈষম্য ও রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মুখোমুখি হচ্ছেন। আবাসন, ভূমির অধিকার, শিক্ষা ও সরকারি পরিষেবার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের বৈষম্য এখনো বহাল রয়েছে। একই সঙ্গে উচ্চমাত্রার সহিংস অপরাধ এবং পুলিশের অপর্যাপ্ত সুরক্ষার কারণে তাঁদের জীবনও হুমকির মুখে।

অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকার ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে বিক্ষোভ করার সময়ও তাঁরা প্রাণঘাতী পুলিশি সহিংসতা ও গ্রেপ্তারের শিকার হয়েছেন। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও সমান নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলেছেন এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। কিন্তু ইসরায়েলের এই ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা কারা? তাঁদের কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়? আর ইসরায়েলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তাঁদের কতটা প্রভাব বিস্তারের সুযোগ রয়েছে?

নিজ মাতৃভূমিতেই সংখ্যালঘু

১৯৪৭ সালের আগে ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ছিলেন ফিলিস্তিনি আরবরা। বর্তমানে এই ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত ইসরায়েল, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকা। ১৯৪৭ থেকে ১৯৪৮ সালের মধ্যে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করতে জায়নবাদী মিলিশিয়া এবং পরবর্তী সময়ে ইসরায়েলি বাহিনী ফিলিস্তিনিদের জাতিগতভাবে নির্মূল করার অভিযান চালায়। ফিলিস্তিনিরা এই বিপর্যয়কে ‘নাকবা’ বা ‘মহাবিপর্যয়’ বলে অভিহিত করেন।

পূর্বপরিকল্পিত সামরিক অভিযানে জায়নবাদী বাহিনী হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে, শত শত গ্রাম ধ্বংস করে এবং ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর ৮০ শতাংশকে জোরপূর্বক নিজেদের মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত করে। ১৯৪৯ সালে প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে সহিংসতার আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে। ফিলিস্তিন দখল ঠেকাতে এসব আরব রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী যুদ্ধে প্রবেশ করেছিল।

ইসরায়েল তত দিনে ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের ৭৮ শতাংশ ভূখণ্ড দখল করে নিয়েছিল। প্রায় দেড় লাখ ফিলিস্তিনি সেই ভূখণ্ডে থেকে গিয়েছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে ইসরায়েল রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ইসরায়েলি বাহিনী তখনো যেসব এলাকায় পৌঁছাতে পারেনি, সেসব এলাকার কিছু বাসিন্দা টিকে যান। অন্যদিকে, কাউকে কাউকে জোরপূর্বক বিতাড়নের প্রচেষ্টা তাঁরা প্রতিরোধ করেছিলেন।

যাঁরা থেকে গিয়েছিলেন, তাঁদের প্রায় এক-চতুর্থাংশই ছিলেন অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত। নিজেদের বাড়িঘরে ফিরে যাওয়ার অধিকার থেকেও তাঁদের বঞ্চিত করা হয়। তাঁদের অনেকের বাড়ি ছিল এমন গ্রামে, যেগুলো ইতিমধ্যে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। এক রাতের মধ্যেই নিজেদের মাতৃভূমিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী থেকে সংখ্যালঘুতে পরিণত হন সেখানে থেকে যাওয়া ফিলিস্তিনিরা।

বর্তমানে ইসরায়েলের প্রায় এক কোটি জনসংখ্যার ২০ শতাংশই ফিলিস্তিনি নাগরিক। তাঁরা প্রধানত উত্তরাঞ্চলের গ্যালিলি, মধ্য ইসরায়েলের ত্রিভুজ অঞ্চল এবং দক্ষিণের নাকাব বা নেগেভ মরুভূমিজুড়ে ফিলিস্তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ শহর ও জনপদে বসবাস করেন। তাঁদের প্রায় ৮০ শতাংশ মুসলিম, ১০ শতাংশ খ্রিষ্টান এবং ১০ শতাংশ দ্রুজ সম্প্রদায়ের মানুষ।

ইসরায়েলি রাষ্ট্র এবং দেশটির সমাজের একটি বড় অংশ তাঁদের সাধারণত ‘ইসরায়েলি আরব’ অথবা ‘ইসরায়েলের আরব নাগরিক’ বলে উল্লেখ করে। তবে তাঁদের অনেকে নিজেদের ‘ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিক’, ‘১৯৪৮ সালের ফিলিস্তিনি’ অথবা ‘ইসরায়েলের অভ্যন্তরে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি’ হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন।

এসব পরিচয়ের মাধ্যমে তাঁরা ইসরায়েলের নাগরিক হওয়ার পাশাপাশি নিজেদের ফিলিস্তিনি জাতীয় পরিচয়ও প্রতিষ্ঠা করেন।

সামরিক শাসন ও প্রতিরোধ

১৯৪৮ সালের পর ফিলিস্তিনিদের ইসরায়েলি নাগরিকত্ব দেওয়া হলেও দেশটির প্রাথমিক সরকারগুলো তাঁদের সন্দেহের চোখে দেখত এবং তাঁদের ওপর রাষ্ট্রীয় সহিংসতা চালাত। ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত কেবল ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ওপর একটি সামরিক শাসনব্যবস্থা কার্যকর ছিল। অন্যদিকে, ইহুদি নাগরিকেরা পরিচালিত হতেন বেসামরিক আইনের অধীনে।

এই সময়ে ফিলিস্তিনিরা চলাচলে বিধিনিষেধ, কারফিউ, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হন। এই সময়ের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোর একটি ছিল কাফর কাসেম হত্যাকাণ্ড। ১৯৫৬ সালের ২৯ অক্টোবর ইসরায়েলি বাহিনী ফিলিস্তিনি গ্রাম কাফর কাসেমে কারফিউ জারির সময় হঠাৎ এগিয়ে আনে। গ্রামের বাইরে কর্মরত শত শত বাসিন্দা এই পরিবর্তনের বিষয়ে কিছুই জানতেন না।

কারফিউ অমান্যকারীদের গুলি করে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল সেনাদের। কর্মীরা কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে গ্রামের প্রবেশমুখে সেনারা তাঁদের থামায় এবং খুব কাছ থেকে গুলি চালায়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নারী, শিশুসহ ৪৯ জন ফিলিস্তিনি নাগরিক নিহত হন। অবশেষে ১৯৬৬ সালে সামরিক শাসনের অবসান ঘটে। এর পরের বছরগুলোতে ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা বৃহত্তর ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ক্রমশ পুনরায় সংযোগ স্থাপন করতে থাকেন। বিশেষ করে ১৯৬৭ সালে ইসরায়েল পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকা দখল করার পর এই যোগাযোগ আরও জোরদার হয়।

১৯৭৬ সালের ৩০ মার্চ সংঘটিত হয় তাঁদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবাদ। গ্যালিলিতে ফিলিস্তিনিদের জমি বাজেয়াপ্ত করার ইসরায়েলি পরিকল্পনার প্রতিবাদে এই বিক্ষোভ শুরু হয়। ইসরায়েলি পুলিশ সহিংসভাবে বিক্ষোভ দমন করে। এতে ছয়জন ফিলিস্তিনি নাগরিক নিহত হন এবং শত শত মানুষ আহত হন। এই ঘটনাগুলো ‘ভূমি দিবস’ বা ‘ল্যান্ড ডে’ নামে পরিচিতি পায়। ফিলিস্তিনিদের ভূমি ও অধিকারের সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে প্রতিবছর ৩০ মার্চ দিনটি পালন করা হয়।

২০০০ সালে শুরু হওয়া দ্বিতীয় ফিলিস্তিনি ইন্তিফাদার সময় ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা দেশটির দখলদারত্বের বিরুদ্ধে এবং অধিকৃত ভূখণ্ডের ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে ব্যাপক বিক্ষোভ করেন। জবাবে পুলিশ প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করে। এতে ১৩ জন ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারী নিহত হন এবং আরও শত শত মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ইসরায়েল রাষ্ট্রের বৈষম্য ও অপরাধ

রাষ্ট্রীয় সহিংসতার পাশাপাশি ধারাবাহিক ইসরায়েলি সরকারগুলোর আমলে কয়েক দশক ধরে বৈষম্যমূলক আইন ও নীতির শিকার হয়েছেন ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা। ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা হাইফাভিত্তিক আইনি সহায়তা সংস্থা আদালাহর (Adalah) মতে, ১৯৪৮ সালের পর থেকে ইসরায়েলে এমন ৬৫টিরও বেশি আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, যেগুলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইসরায়েল ও অধিকৃত ভূখণ্ডে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের প্রতি বৈষম্য সৃষ্টি করে।

এসব আইন ভূমির মালিকানা, আবাসন, সরকারি অর্থায়ন এবং পরিবার পুনর্মিলনের মতো বিভিন্ন বিষয়কে প্রভাবিত করে। এর প্রাথমিক উদাহরণগুলোর একটি হলো ১৯৫০ সালে পাস হওয়া ‘অ্যাবসেন্টিজ প্রপার্টি ল’ বা ‘অনুপস্থিত ব্যক্তিদের সম্পত্তি আইন’।

এই আইনে ১৯৪৮ সালের নাকবার সময় বাড়িঘর ছেড়ে চলে যাওয়া, পালিয়ে যাওয়া কিংবা জোরপূর্বক বিতাড়িত হওয়া ফিলিস্তিনিদের ‘অনুপস্থিত ব্যক্তি’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। এর ফলে তাঁদের জমি, বাড়িঘর ও অন্যান্য সম্পত্তি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এমনকি পরবর্তী সময়ে ইসরায়েলের নাগরিক হওয়া কিছু ফিলিস্তিনির সম্পত্তিও এই আইনের আওতায় পড়ে।

এরপর, ২০০৩ সালে ইসরায়েল এমন একটি আইন পাস করে, যার মাধ্যমে ইসরায়েলি নাগরিকদের সঙ্গে অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকার বাসিন্দাদের বৈবাহিক সম্পর্কের ভিত্তিতে পরিবার পুনর্মিলনের সুযোগ সীমিত করা হয়। ২০১১ সালের একটি আইন নির্দিষ্ট কিছু কৃষিভিত্তিক জনপদ ও আবাসিক সম্প্রদায়ের শহরে বসবাসের আবেদনকারীদের যাচাই-বাছাই করার ক্ষমতা দেয় ভর্তি-সংক্রান্ত কমিটিগুলোকে।

সমালোচকদের মতে, এই আইন ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের সুযোগ তৈরি করে। কারণ, কোনো আবেদনকারীকে সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের ‘জায়নবাদী-ইহুদি চরিত্রের’ সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হলে এসব কমিটি তাঁকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে। সবচেয়ে বিতর্কিত পদক্ষেপগুলোর একটি আসে ২০১৮ সালে। সে বছর ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে ‘বেসিক ল: ইসরায়েল অ্যাজ দ্য নেশন-স্টেট অব দ্য জিউইশ পিপল’ বা ‘মৌলিক আইন: ইহুদি জনগণের জাতিরাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েল’ পাস হয়। এই আইন ইসরায়েলে জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার কেবল ইহুদি জনগোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষিত রাখে।

এ ছাড়া, আরবি ভাষার মর্যাদা আনুষ্ঠানিক ভাষা থেকে কমিয়ে ‘বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন’ ভাষায় নামিয়ে আনা হয়। একই সঙ্গে ইহুদি বসতি স্থাপনকে জাতীয় মূল্যবোধ হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং রাষ্ট্রকে তা উৎসাহিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। আইনগত বৈষম্যের পাশাপাশি ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে সংগঠিত অপরাধ ও সহিংস হত্যাকাণ্ডের সংকটও ক্রমেই গভীর হচ্ছে। ইসরায়েলি নাগরিক সমাজের সংগঠন ‘দ্য আব্রাহাম ইনিশিয়েটিভস’ এই সংকটের সঙ্গে এমন পরিস্থিতির সম্পর্ক তুলে ধরেছে, যাকে তারা পুলিশের অপর্যাপ্ত তৎপরতা এবং ইসরায়েলি পুলিশের সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক হিসেবে বর্ণনা করেছে।

২০২৩ সালে সংস্থাটি জানায়, ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার মাত্র ২০ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও দেশটির সামগ্রিক সহিংস অপরাধের ৫০ শতাংশের শিকার হন ফিলিস্তিনিরা। ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেছেন, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসার ক্ষেত্রে ইসরায়েলি পুলিশ চোখ বন্ধ করে রাখে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে এই অবৈধ ব্যবসার প্রসারেও সহায়তা করে।

তবে ইসরায়েলি সরকার অপরাধ পরিস্থিতির জন্য নিজেদের দায় অস্বীকার করে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। ২০২২ সালে নিহত হন মোট ১১৬ জন। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৪৪ জনে। নিহতদের অধিকাংশই কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না। ২০২৫ সালে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৫২ জনে পৌঁছায়, যা নথিবদ্ধ ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর হিসেবে বিবেচিত হয়।

আব্রাহাম ইনিশিয়েটিভসের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনেও হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গুরুতর বৈষম্যের চিত্র উঠে আসে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত এলাকায় হত্যাকাণ্ডের ১৫ শতাংশেরও কম ক্ষেত্রে অপরাধী শনাক্ত বা মামলা সমাধান করতে পেরেছে ইসরায়েলি পুলিশ। বিপরীতে, ইহুদি নিহত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৬৫ শতাংশ।

রাজনৈতিক দল ও ক্ষমতার লড়াই ফিলিস্তিনি আরবরা

বৈষম্য, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দখলদারত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করতে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার পথ বেছে নিয়েছেন। ১৯৫০-এর দশকেই তাঁদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হয়। তবে সামরিক শাসন ও রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলা এবং জনজীবনে অংশগ্রহণের সুযোগ মারাত্মকভাবে সীমিত করে রেখেছিল। ১৯৭০-এর দশকে এসে ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা আরও শক্তিশালী পার্লামেন্টীয় ও তৃণমূলভিত্তিক আন্দোলন গড়ে তুলতে শুরু করেন।

১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘হাদাশ’ বা ‘ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট ফর পিস অ্যান্ড ইকুয়ালিটি’। ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মধ্যে এটি এখনো অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তি। পরবর্তী কয়েক দশকে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল আত্মপ্রকাশ করে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘বালাদ’ বা ‘ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যাসেম্বলি’, ‘তা’আল’ বা ‘আরব মুভমেন্ট ফর রিনিউয়াল’ এবং ‘রা’আম’ বা ‘ইউনাইটেড আরব লিস্ট’। ১৯৮২ সালে গঠিত হয় ‘হাই ফলো-আপ কমিটি ফর আরব সিটিজেনস অব ইসরায়েল’। রাজনৈতিক দল ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিত্বকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ আমব্রেলা সংগঠনে পরিণত হয় এটি।

পার্লামেন্টের বাইরে ফিলিস্তিনি সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বকারী অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে এই কমিটি। এটি স্থানীয় পৌরসভাগুলোর সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক আন্দোলনের সংযোগ স্থাপন করে।

ফিলিস্তিনিদের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলো আত্মপ্রকাশের পর থেকেই নেসেট নির্বাচনে অংশ নিয়ে আসছে। তবে এসব দল দীর্ঘদিন ধরেই মূলত সরকার গঠনকারী জোটের বাইরে থেকেছে। ২০১৫ সালে হাদাশ, বালাদ, তা'আল ও রা'আম একত্র হয়ে ‘জয়েন্ট লিস্ট’ গঠন করে। এর পেছনে ছিল ২০১৪ সালে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ন্যূনতম ভোটের সীমা ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত। এতে আশঙ্কা তৈরি হয় যে ছোট দলগুলো এককভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে পার্লামেন্টে প্রবেশ করতে সমস্যায় পড়বে।

২০২০ সালের মার্চের নির্বাচনে জয়েন্ট লিস্ট ১৫টি আসন লাভ করে। এর মধ্য দিয়ে জোটটি নেসেটের তৃতীয় বৃহত্তম পার্লামেন্টীয় ব্লকে পরিণত হয়। পরবর্তী সময়ে অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের কারণে জোটটি ভেঙে যায়। ফলে সম্মিলিত রাজনৈতিক শক্তি ও প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়ে।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিনিদের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা করাকে ইসরায়েলের রাজনীতিতে কার্যত নিষিদ্ধ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হতো। অনেক ইহুদি ইসরায়েলি ভোটার এ ধরনের রাজনৈতিক অংশীদারত্বের বিরোধিতা করতেন। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মধ্যেও মতভেদ ছিল। সরকারে অংশ নিলে আদৌ অর্থবহ পরিবর্তন আনা সম্ভব কি না, তা নিয়ে তাঁরা একমত ছিলেন না।

২০২১ সালে এই রাজনৈতিক বাধা ভেঙে যায়। সে বছর নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনকারী জোটে যোগ দেয় রা’আম। দলটির চারটি আসন পার্লামেন্টে প্রয়োজনীয় সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। এর ফলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর টানা ১২ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।

এবারে, ২০২৬ সালের নির্বাচন সামনে রেখে হাদাশ, বালাদ ও তা’আল আবারও একত্র হয়ে জয়েন্ট লিস্ট গঠন করেছে। অন্যদিকে, রা’আম পৃথক রাজনৈতিক দল হিসেবেই রয়ে গেছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই দুটি নির্বাচনী জোট সম্মিলিতভাবে ১৮ থেকে ২০টি আসন পেতে পারে। এমনটি হলে সরকার গঠন নিয়ে জোটের দর-কষাকষিতে ফিলিস্তিনিদের নেতৃত্বাধীন দলগুলোর প্রভাব আবারও বাড়তে পারে।

এর ফলে ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার গঠনে কারা ক্ষমতায় আসবে, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে এসব দলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্বকে কাজে লাগিয়ে ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা নিজেদের জন্য অর্থবহ রাজনৈতিক পরিবর্তন আদায় করতে পারবেন কি না, সেটিও নির্ধারিত হতে পারে।

ইসরায়েলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভূমিকা তাই ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কয়েক দশকের বৈষম্য, দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক প্রান্তিকীকরণের মধ্যেও তাঁদের সংগ্রাম থেমে নেই। এখন প্রশ্ন হলো, পার্লামেন্টীয় আসন ও জোটের রাজনীতিতে অর্জিত প্রভাবকে তাঁরা নিজেদের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার বাস্তব শক্তিতে রূপান্তর করতে পারবেন কি না।

মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

ইসরায়েলের নির্বাচন ফিলিস্তিন ইস্যুতে নীতির পরিবর্তন আনবে কি

বিশ্লেষকদের ভুল প্রমাণ করে ইসরায়েলের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে আরবরা

দিনে দিনে কেন ছোট হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিয়ের আয়োজন

রাজপথের লড়াকু শ্রমিক নেতা থেকে প্রেসিডেন্ট: ব্রাজিলে লুলার প্রত্যাবর্তন যে কারণে ঐতিহাসিক

ভুট্টো কেন নিজেকে ভারতীয় নাগরিক প্রমাণে মরিয়া ছিলেন

যে পাঁচ উপায়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি বদলে দিয়েছেন ট্রাম্প

প্রথম দফায় হেরেও দ্বিতীয় দফায় কীভাবে জিতলেন ব্রাজিলের লুলা

মার্কিন নির্বাচনের পর ইরানে হামলার কৌশলও কেন কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না

ইউক্রেনকে পঙ্গু করতে রাশিয়ার ‘হিট লিস্টে’ যেসব স্থাপনা

মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ: এর মানে কী