আমি সক্রিয় ছাত্ররাজনীতিতে জড়িত হই ১৯৮২ সালের মার্চে; জেনারেল এরশাদের জবরদস্তিমূলক রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরপর, বিশেষত ক্ষমতা জবরদখলের পর প্রথম হুমকিমূলক একটি ঘোষণা প্রচারের পর। যে ঘোষণায় বলা হয়েছিল, ‘আকারে ইঙ্গিতে, আচারে-উচ্চারণে সামরিক শাসনের সমালোচনা করলেও সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হবে।’ বুঝুন অবস্থা। দেশ আমার, রাষ্ট্রের একজন নাগরিক আমি, কিন্তু দেশ কীভাবে চলবে কিংবা চলবে না, সেটা আমি বলতে পারব না! সশস্ত্র বাহিনীর একজন বেতনভুক কর্মকর্তা তা ঠিক করবেন, আর তাঁর অনৈতিক ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করার সহজাত অধিকার থেকে সব নাগরিককে বঞ্চিত থাকতে হবে। আধুনিক জমানায় এ রকম একটা মধ্যযুগীয় বিধান মেনে নেওয়া যায়? নাকি মেনে নেওয়া উচিত? তখন আমার মনে হয়েছিল, আপাতত সাহিত্য-সংস্কৃতি অন্যরা করুন, আমার এখন প্রধান কাজ প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক প্রতিরোধে অংশগ্রহণ করা।
...আমার জীবনের এ সময়টা নিজের কাছে এখনো খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। এ সময়টাতেই আমার জীবনবোধ, জীবনের বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি, জনকল্যাণে জীবন ব্যয় করার ধারণা ইত্যাদি মন ও মননের ভেতর একটা মূর্ত রূপ পরিগ্রহ করেছিল। এ সময়টাতেই রাজনীতি ও দর্শনের, বিশেষত পশ্চিমা চিরায়ত রাজনৈতিক দর্শনের—বুর্জোয়া ও মার্ক্সবাদী কিছু প্রধান ‘টেক্সট’ পাঠ করার সুযোগ হয়। প্রসঙ্গত বলা উচিত যে এই সময়টাতে বিশেষত মার্ক্স, অ্যাঙ্গেলস, লেনিন, মাও প্রমুখ কমিউনিস্ট দার্শনিক-রাজনীতিকের কিছু মৌলিক গ্রন্থ পাঠের পদ্ধতিগত দিকনির্দেশনা দিয়ে ফরহাদ মজহার আমাকে সাহায্য করেছিলেন, ওই নির্দেশনা মার্ক্সবাদী নানা টেক্সট বুঝতে আমাকে সহযোগিতা করেছিল। ইতিপূর্বে ছাত্র ঐক্য ফোরামের রাজনীতির জাতীয় পর্যায়ে ট্রানজিশন প্রচেষ্টায় তিনি সক্রিয়ভাবে জড়িত হয়েছিলেন। সে প্রচেষ্টা নানা কারণে ব্যর্থ হয়েছে। ইতিমধ্যে আমাদের ‘চেনা’ ফরহাদ মজহার অনেক ‘বদলে’ গিয়েছিলেন। ফলে আমাদের রাজনৈতিক সম্পর্কও ছিন্ন হয়ে যায়। পরবর্তীকালে তিনি আরও ‘বদলে’ যান, যেটা দূর থেকে দেখাও আমাদের অনেকের জন্য বেদনাদায়ক। তথাপি বলব, আমার বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশে তাঁর অবদান আছে। তবে আমার ব্যক্তিগত বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতার ভেতর ‘বদলে যাওয়া’ ফরহাদের কোনো প্রভাব নেই।
তথ্যসূত্র: ফেরদৌস মাহমুদ কর্তৃক নূরুল কবীরের সাক্ষাৎকার গ্রহণ, সাখাওয়াত টিপুর সম্পাদিত ‘তর্ক’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত।