সত্যিকার অর্থে বলতে গেলে আমার জীবনে অপূর্ণতা ছিল না। নিজের জীবনে আমি যা চেয়েছি, তা খুব সাধারণ চাওয়া ছিল। আমি ছেলেবেলা থেকেই ইঁচড়ে পাকা ছিলাম। আমার পরিবারই আমাকে ইঁচড়ে পাকা বানিয়েছে। ছেলেবেলা থেকে পাঠ্যপুস্তকের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কম ছিল। অপাঠ্য (সহ-পাঠক্রমিক) সব বই ছিল আমার পড়ার আগ্রহে। ক্লাস থ্রিতে থাকাবস্থায় আমি শরৎচন্দ্রের তিন-চারটা বই পড়ে শেষ করি। ম্যাট্রিক পাস করার আগেই বঙ্কিমচন্দ্র শেষ করেছি প্রবন্ধসহ। পাঠ্যপুস্তক খুব বেশি একটা পড়তাম না। অঙ্কে খুবই কাঁচা ছিলাম। ৩৩ নম্বর পেয়েছি। তখন তো ৩০ নম্বরে পাস ছিল। তাই আমি গর্ব করে বলতাম ৩ নম্বর বেশি পেয়েছি।
এভাবেই আমি এমএ-ও পাস করি। আনন্দমোহন কলেজে অধ্যাপক সুদেন্দ্র চক্রবর্তীর বক্তৃতা শুনছিলাম। বক্তৃতায় তিনি যা বলছিলেন তা এখনো মনে আছে আমার। তো ওই দিন আমার সুদেন্দ্র চক্রবর্তীর বক্তব্য শুনে মনে হলো, কলেজের প্রফেসরের চেয়ে বড় আর কিছু নয়। কাজেই আমাকে প্রফেসর হতে হবে। সে দিনই আমি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলাম। আমি দরিদ্র পরিবারের সন্তান। কাজেই দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করতে পারব না। দারিদ্র্যের সঙ্গে সহাবস্থান করেই এ জীবন চালিয়ে এসেছি। আমি কলেজের অধ্যাপক হয়েছি। এর চেয়ে বড় কিছু পাওয়ার আমার স্বপ্ন ছিল না। ‘অধ্যাপক’ হিসেবে নই, আমি বলি ‘শিক্ষক’ হিসেবে আমি সার্থক। খুবই সার্থক। অন্যকিছুতে আমার সার্থকতা নেই।
এই যে লেখালেখি, সত্যি কথা বলতে, আমার লেখা আমার নিজেরই পছন্দ হয় না। কিন্তু শিক্ষক হিসেবে আমি সার্থক। আমি ব্যাকরণ পড়াতাম। ব্যাকরণ হলো একটি রসকষহীন বিষয়। অনেকেই বোঝে না। কিন্তু আমার ব্যাকরণ ক্লাসে আনন্দমোহন কলেজের ছাত্ররাও এসে ক্লাস করত। কাজেই এ ব্যাকরণটাই আমি যেভাবে পড়াতে পারতাম, সেখানে আর কেউ পড়াতে পারত না। আমি একবার দেড় বছর জেলখানায় ছিলাম। জেলখানায় বসে ভাবি, আমি কী করব? আমার লেখালেখির কিছু নেই। ব্যাকরণ পড়াতাম। তখন ‘ব্যাকরণের ভয় অকারণ’ নামে একটি প্রবন্ধের বই লিখি।
তথ্যসূত্র: মুহাম্মদ ফরিদ হাসান কর্তৃক যতীন সরকারের সাক্ষাৎকার গ্রহণ, ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত