প্রতিবন্ধীদের ভোট দেওয়ার সুযোগ বৃদ্ধির প্রস্তাব আমলে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। একে ইতিবাচক দিক বলে উল্লেখ করেছেন সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির মডারেটর ফওজিয়া মোসলেম। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশন বরাবর দেওয়া স্মারকলিপির সুপারিশসমূহ প্রকাশ করেছে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি। ৭১টি নারী, মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত প্ল্যাটফর্মটি নির্বাচনকে সামনে রেখে নারী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা বিষয়ে উদ্বেগ এবং সুপারিশসমূহ তুলে ধরেছে নির্বাচন কমিশনের কাছে। আজ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তারা সুপারিশসমূহ তুলে ধরে।
সংবাদ সম্মেলনে মডারেটর ছিলেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম। সুপারিশসমূহ উপস্থাপন করেন অ্যাকশন এইডের উইমেন রাইটস অ্যান্ড জেন্ডার ইকুইটির লিড মরিয়ম নেছা। ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে গণতান্ত্রিক ধারা ফিরিয়ে আনার জন্য নানা দিক থেকে নানা প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে নারী প্রার্থী বৃদ্ধির জন্য সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির পক্ষ থেকে তাগিদ দেওয়া হয়েছিল। কিন্ত দেখা গেল, এই নির্বাচনে মাত্র ৪.০৮ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, যা কাঙ্ক্ষিত নয়। আমরা ইতিমধ্যে আমাদের সুপারিশমালা নির্বাচন কমিশনে পাঠিয়েছিলাম। সেখানে আমরা প্রতিবন্ধী প্রার্থীদের ভোটদানের সুযোগ বৃদ্ধি করার প্রস্তাব করেছিলাম; যা নির্বাচন কমিশন আমলে নিয়েছে। এটা একটা ইতিবাচক দিক বলে আমরা মনে করি।’
প্রশ্নোত্তরকালে উপস্থিত বক্তারা জানান, এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের যে সংখ্যা, তা তাঁদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁরা বলেন, ‘নির্বাচনে মনোনয়নপ্রক্রিয়ায় আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থা, নারীর প্রতি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোভাব, পেশিশক্তি, অর্থ ইত্যাদির প্রভাব রয়েছে।’ এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের দাবি জানান তাঁরা। যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরাই পাঁচ শতাংশ আসনে নারীর মনোনয়ন দিতে চেয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, তা আরও কম। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন পদক্ষেপ নিতে পারত বলে তাঁরা উল্লেখ করেন। বক্তারা আরও পরিষ্কার করেন যে, ধর্ম মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয়। ধর্মের সঙ্গে রাজনীতি এক করে ফেললে ধর্ম কলুষিত হবে এবং রাজনীতি বিভাজিত হবে বলে উল্লেখ্য করেন তাঁরা। কাজেই, কারও দলীয় স্বার্থে নয়, নারী আন্দোলনের সামগ্রিক কল্যাণে যেটা উপযুক্ত, সে ব্যাপারে কথা বলার আহ্বান জানান বক্তারা।
নির্বাচন কমিশনের কাছে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির সুপারিশসমূহ হলো—
১. দেশের সব প্রান্তের সব নাগরিক যাতে নির্বিঘ্নে ও স্বাধীনভাবে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচনপূর্ববর্তী, নির্বাচনকালীন ও নির্বাচনপরবর্তী সময়ে নারীসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং সুবিধাবঞ্চিত প্রান্তিক নারী-পুরুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।
২. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সব ধরনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নারীদের প্রতি হয়রানি, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও সহিংস আচরণ প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
৩. নির্বাচনী ব্যয় সংকোচ করে ন্যূনতম নির্বাচনী ব্যয় নির্ধারণ করতে হবে এবং এ বিষয়ে কঠোরভাবে মনিটরিং করতে হবে।
৪. স্বতন্ত্রসহ নির্বাচনে সব নারী প্রার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে।
৫. নারী, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী যাতে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, সেদিকে দৃষ্টি রেখে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুবিধাজনক স্থানে ভোটকেন্দ্র স্থাপন করতে হবে।
৬. জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-নির্বিশেষে সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার জন্য নিরপেক্ষভাবে সব ধরনের সহায়তা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
৭. নির্বাচনী প্রচারণায় ধর্মের ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে।
৮. সব জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
৯. যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক, সাম্প্রদায়িক ও নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
১০. নির্বাচনী প্রচারণায় ধর্মীয় সখ্যালঘু সম্প্রদায় ও ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষদের হুমকিদাতাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ওয়াইডব্লিউসিএ অব বাংলাদেশ, এডাব, ব্র্যাক, একশন এইড বাংলাদেশ, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, আইইডি, প্রাগ্রসর, স্টেপস টুয়াডর্স ডেভেলপমেন্ট, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি, কর্মজীবী নারী, ওয়ার্ল্ড ভিশন ও গণসাক্ষরতা অভিযানের প্রতিনিধিরা, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নেতারা, সম্পাদকমণ্ডলী ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের অ্যাভোকেসি অ্যান্ড নেটওয়ার্কিং পরিচালক জনা গোস্বামী।