হোম > নারী

থেরোইন দ্য মেরিকুর বিস্মৃত এক বিপ্লবী

মইনুল হাসান, ফ্রান্স  

প্রতীকী ছবি

৪ জুন ১৮১৭ সাল। পাগলাগারদের নিঃসঙ্গ, নির্জন শীতল কুঠুরিতে মারা গেছেন একজন নারী। যৌবনে তাঁকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছিল। তাঁর আর বাড়ি ফেরা হয়নি। কেউ তাঁর জন্য অপেক্ষা করে থাকেনি। প্যারিসের সালপেত্রিয়ের এক মানসিক হাসপাতালে জীবনের ২৩টি বসন্ত অবরুদ্ধ থাকার পর মৃত্যুবরণ করলেন ৫৪ বছরের নারী থেরোইন দ্য মেরিকুর। কোনো সংবাদপত্রে সেই খবর ছাপা হয়নি সেদিন।

এই নারীর পরিচয় জানার আগে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৭৯৩ সালে। ফরাসি বিপ্লবের চার বছর পরে, প্যারিসের এক জনাকীর্ণ জায়গায় শোরগোল ছাপিয়ে নারী কণ্ঠের মুহুর্মুহু আর্তচিৎকারে বাতাস প্রকম্পিত হচ্ছিল। সে সময় সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক এবং বিপ্লবীদের নেতা জঁ পল ম্যরা (১৭৪৩-১৭৯৩)। তিনি এগিয়ে গেলেন চিৎকার লক্ষ্য করে। দেখলেন একদল নারী একজন তরুণীকে উলঙ্গ করে চাবুকের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করে চলছে মহা উৎসাহে। একদল পথচারী ভিড় করে সেই দৃশ্য উপভোগ করছে। জঁ পল হুংকার দিলেন, থামতে বললেন চাবুকধারী নারীদের। তিনি তাঁদের হাত থেকে রক্তাক্ত এবং মুমূর্ষু সেই তরুণীকে উদ্ধার করেন।

কে এই তরুণী? কেনই-বা একদল উন্মত্ত নারী তাঁকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে জানা যাবে, ৩১ বছর বয়সের দীর্ঘাঙ্গী স্বর্ণকেশী সুন্দরী তরুণীর নাম থেরোইন দ্য মেরিকুর (১৭৬২-১৮১৭)।

ফরাসি বিপ্লবের উত্তাল সময়ে নারীদের অধিকার নিয়ে কথা বলতেন। পুরুষদের হটিয়ে নয়, তাঁদের পাশাপাশি থেকে বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় নারীদের রাজনৈতিক সংগঠনে যুক্ত হতে, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে, রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে উৎসাহ দিতেন, উজ্জীবিত করতেন। নারী নাগরিকদের পূর্ণ নাগরিক মর্যাদার জোর দাবি জানাতেন। সে সময়ে পুরুষেরা যখন বিপ্লবের সবটুকু কৃতিত্ব, সাফল্য নিজেদের বলে দাবি করত, তিনি তাতে বাদ সেধেছিলেন। এক পা এগিয়ে, নারীদের অস্ত্র হাতে আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণের পক্ষে কথা বলতেন তিনি। শুধু তা-ই নয়, ‘লিজিওন অব আমাজনস’ নামে একটি নারী বাহিনী গঠন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, নারীদের পুরুষের সমান হিসেবে লড়াই করা উচিত। তাই তিনি বলেছিলেন, ‘আসুন, পুরুষদের মতোই আইন মেনে আমরা অস্ত্র হাতে নিই, নারীদের অস্ত্র বহনের অধিকার থাকা উচিত।’ তিনি বলতেন, ‘আমরা পুরুষদের দেখিয়ে দিতে চাই, মেধা, সাহস আর দক্ষতায় আমরা নারীরা পুরুষদের থেকে কোনোভাবেই কম নই।’

মাথায় লম্বা পাখির পালক গোঁজা হ্যাট পরতেন। পোশাকপরিচ্ছদে ছিলেন ভীষণ ফ্যাশনদুরস্ত। তিনি ছিলেন সক্রিয় এবং দৃঢ়চেতা একজন রাজনৈতিক কর্মী। জনসমক্ষে জ্বালাময়ী বক্তব্যে নিজের আদর্শ প্রচার করতেন এবং নিজের হাতে রাজপথের দেয়ালগুলোতে পোস্টার সাঁটাতেন। তিনি খুব করে চাইতেন, নারীদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে, নারীকে পুরুষের সমমর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করতে। নারীদের প্রতি অবিচারের প্রতিবাদ করতেন তীব্র বাক্যবাণে। তাঁদের দুর্দশা ও দারিদ্র্যে তিনি ব্যথিত হতেন।

সাধারণের মধ্যে বাড়তে থাকে তাঁর জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা। তাতেই ভীত হয়ে উঠেছিল ক্ষমতার কেন্দ্রে আসীন কট্টরপন্থীরা। তাঁর এমন প্রগতিশীল চিন্তাভাবনা, রক্ষণশীল সমাজের ভিত নাড়িয়ে দেয়। সে কারণেই তাঁকে দমিয়ে দেওয়ার জন্য তৎকালীন এক বিখ্যাত রাজতন্ত্রপন্থী সাংবাদিককে হত্যা এবং রানি মারি আঁতোয়ানেতকে গুপ্তহত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। তাঁকে জনসমক্ষে চাবুক মারা হয়। সে সময়ে রক্ষা পেলেও গিলোটিনে শিরশ্ছেদের ভয়ে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন, এমন ভান করেন।

ফলে তাঁকে আমৃত্যু পাগলাগারদের ছোট্ট একটি নির্জন কুটিরে একাকী জীবনের ২৩টি বছর অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। অথচ তারুণ্যের দিনগুলোতে তিনি অগ্নিশিখার মতো জ্বলে উঠেছিলেন। সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন মানব ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়া ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবে।

সেই বিপ্লব ছিল একদল মুক্তিপাগল আলোকিত মানুষের অসমসাহস, দৃঢ় সংকল্প আর সংগ্রামের এক অনন্য নিদর্শন। এ বিপ্লবে দেশের নারীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করলেও বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে, নারীদের নিয়ে তেমন আলোচনা হয়নি। অথচ ফরাসি বিপ্লবে নারীদের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ অংশগ্রহণ, আত্মত্যাগ প্রমাণ করে, বিপ্লব শুধু পুরুষদের বিষয় ছিল না। তাঁদের মেধা, শক্তি, সাহস এবং দৃঢ়সংকল্প ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাসে এক আলোকিত অধ্যায় সংযোজন করেছিল। পুরুষের পাশাপাশি তাঁরা তাঁদের মত প্রকাশ করেছেন, নিরলস লিখেছেন, চিন্তা করেছেন, কাজ করেছেন। একটি বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন এবং দেখিয়েছেন পরম পারঙ্গমতায়।

সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা—যদি তা না হয়, তাহলে মৃত্যু শ্রেয়; এমন শপথে ফরাসি বিপ্লবের আগুন প্রজ্বলিত হয়েছিল। ‘প্রত্যেক মানুষ সমান অধিকার এবং স্বাধীন হয়ে জন্ম নেয়’, এই অমোঘ সত্য সামনে রেখে লড়াই হয়েছিল। অথচ তৎকালীন পুরুষশাসিত সমাজের রক্ষণশীলতার বিষবৃক্ষের শিকড় ছিল সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে। বিপ্লবের পরপরই যে কয়েকজন নারী সেই বিষবৃক্ষের বিষ নাশ করতে চেয়েছিলেন, নারী রক্ষীবাহিনীর স্বপ্নদ্রষ্টা থেরোইন দ্য মেরিকুর ছিলেন তাঁদের একজন। বিস্মৃতির ভগ্নস্তূপ তাঁর দীপ্তিকে আড়াল করতে পারেনি। সেই সংগ্রামী নারী মারা গেলেন অজ্ঞাতবাসের অবহেলায়।

অপমানিত লাঞ্ছিত আত্মা, শেষনিশ্বাসে তাঁর মুক্তি। তিনি মুক্তির সীমানায় লীন হয়ে গেলেও ফরাসি রক্ষণশীল সমাজে একটি বেশ বড় ধরনের ঝাঁকি দিতে পেরেছিলেন। চিন্তার মুক্তিকে ত্বরান্বিত করতে পেরেছিলেন। ক্ষুদ্র জীবনের ব্যাপ্তিতে বিপ্লবের আকাশে তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল উল্কাপিণ্ড, বিস্মৃত এক বিপ্লবী।

পাহাড়ে বসেই স্বপ্নচূড়া গড়েছেন নেইম্রা

অক্টোবর জুড়ে হত্যার নির্মম বলি ৪২ নারী ও কন্যা

সশস্ত্র সংঘাতে প্রতিদিন প্রাণ হারাচ্ছে প্রায় ২৫ জন নারী ও কন্যাশিশু

যুদ্ধবিমানের ককপিটে সত্যিকারের রানি

নার্স ও সাংবাদিক থেকে প্রেসিডেন্ট

কালীগঙ্গার বুকে নারীদের রাঙা পাল

আখ কাটতে গিয়ে জরায়ু হারাচ্ছেন মহারাষ্ট্রের নারী শ্রমিকেরা

৯ মাসে নির্যাতনের শিকার ২১৭১ নারী ও কন্যাশিশু

অন্ধকার জীবন থেকে মানবাধিকারের লড়াইয়ে ফরিদা পারভীন

নিউক্লীয় ফিশনের রূপকার লিজ মাইটনার